দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল ভূগর্ভস্থ খনি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি থেকে রেলপথে পাথর পরিবহন প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। রেললাইন সংস্কারের অভাব, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক চুরির ঘটনায় ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ অকেজো হয়ে পড়ায় বর্তমানে বাধ্য হয়ে সড়কপথে দ্বিগুণ ব্যয়ে পাথর পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পাথরের বাজারমূল্যেও প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী খনির উৎপাদিত পাথরের ৮০ শতাংশ রেলপথে পরিবহনের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি ১৯৭৩-৭৪ সালে আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৪ সালের ২০ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন এবং ২০০৭ সালের ২৫ মে থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাথর উৎপাদন শুরু হয়। প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথে ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পাথর পরিবহন চললেও ২০১১ সালে ৭০টি স্লিপার চুরি যাওয়ার পর রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকায় রেললাইনের বিভিন্ন অংশ দখল, চুরি ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। প্রায় ৫ কিলোমিটার রেললাইন, ৬ হাজারের বেশি নাট-বল্টু চুরি হয়েছে। এসব ঘটনায় পার্বতীপুর রেলওয়ে থানায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বর্তমানে খনির ১২টি ইয়ার্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন পাথর মজুত রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে নদী শাসন ও রেলপথ নির্মাণে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ বোল্ডার ও ব্লাস্ট পাথর রয়েছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় খনি কর্তৃপক্ষ আর্থিক চাপে পড়েছে।
খনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের বার্ষিক পাথরের চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টন। অথচ পরিবহন সংকটের কারণে মধ্যপাড়ার উন্নতমানের পাথরের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদেশ থেকে পাথর আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে এবং সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সেবা) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম রিটু বলেন, ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলপথ চালু হলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং পাথর বিপণন আরও সহজ হবে।
রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী মো. আমিনুল হাসান জানান, প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পর্যন্ত রেলপথ সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. আমজাদ হোসেন বলেন, রেলপথ চালু হলে পাথর পরিবহনে খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে। বর্তমানে সড়কপথে প্রতি টন পাথর পরিবহনে যেখানে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেখানে রেলপথে একই পরিমাণ পাথর পরিবহনে খরচ হবে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত রেলপথ সংস্কার ও চালু করা গেলে পরিবহন ব্যয় কমবে, পাথর বিক্রি বৃদ্ধি পাবে এবং মধ্যপাড়া খনি দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।