হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক শীর্ষ নেতাকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার অবসান ঘটেছে আদালতের সিদ্ধান্তে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্যসচিব মাহদী হাসানকে জামিনে মুক্তি দিয়েছেন আদালত। রোববার (৪ জানুয়ারি) সকালে হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল মান্নানের আদালত শুনানি শেষে তার জামিন মঞ্জুর করেন।
এর আগে শনিবার রাতে শহরের শাস্তানগর এলাকার নিজ বাসা থেকে মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে সদর থানার সামনে জড়ো হন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা এবং তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থানার সামনে সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়।
পরবর্তীতে আন্দোলনের নেতারা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করলেও ম্যাজিস্ট্রেট অনুপস্থিত থাকায় তখন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। রোববার (৪ জানুয়ারি) সকালে শুনানি শেষে আদালত মাহদী হাসানকে জামিন দেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৭ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার-ভিডিপি ও স্থানীয় প্রশাসনের হাজার হাজার সদস্য। ৩০০ আসনের প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে প্রতিটি কেন্দ্রে ১৩ থেকে ১৮ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সদস্য দায়িত্বে থাকবেন। মেট্রোপলিটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশ অস্ত্রসহ দায়িত্ব পালন করবে, মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিজিবি ও র্যাব হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করতে পারবে। ভোটের চার দিন আগে ও দুই দিন পর পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালানো হবে, অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা থাকবে। ভোটের আগে ও দিনে মোটরসাইকেল, ট্যাক্সি, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে এবং লাইসেন্সধারীদের জন্য অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের তফশিল ঘোষণার পর বাস্তব পরিস্থিতি এবং নির্বাচনি সহিংসতার পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গৃহীত।
যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি ও ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলছেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পির ‘পরিকল্পনাতেই’ হাদিকে হত্যা করা হয়। শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলেই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিট দেওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১২ জন গ্রেফতার এবং পাঁচজন পলাতক রয়েছে বলে তিনি জানান। ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী জুলাই বিপ্লবী ওসমান হাদিকে গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে গুলি করে দুই সন্ত্রাসী। গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
গণ-অভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনকালীন সময়ে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত করেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদের মধ্যে ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ, যাদের মৃত বলে ধরা হচ্ছে। এছাড়া সময়সীমা অতিক্রমের পর আরও ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কমিশন নিশ্চিত করেছে, অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে অন্তত ২৮৭টি মৃত্যু সরাসরি গুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। কমিশনের তথ্যমতে, ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি বৈধ গুম হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এর মধ্যে ১১৩টি অভিযোগ গুমের সংজ্ঞার বাইরে, যেমন স্বাভাবিক গ্রেপ্তার বা হেফাজতের সময় ২৪ ঘণ্টার কম হওয়া। কমিশন ধারণা করছে, প্রকৃত গুমের সংখ্যা আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে। গুমের ঘটনায় র্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার নাম উঠে এসেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অভিযোগের প্রায় এক-চতুর্থাংশে র্যাবের সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ রয়েছে। গুম হওয়া ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৯৬.৭ শতাংশ (৯৪৮ জন) বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ৪৭৬ জন (৫০.২%), ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৩৬ জন (২৪.৯%), বিএনপির ১৪২ জন (১৫%), জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ৪৬ জন (৪.৯%) ও যুবদল ১৭ জন (১.৮%)। কমিশন মন্তব্য করেছে, গুমের ঘটনা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল না এবং বিরোধী দলের সদস্যদের ওপর লক্ষ্যবস্তু করে পরিচালিত হয়েছে। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১,৫৪৬ জনের মধ্যে পুরুষ ১,৫২৩ জন (৯৮.৫%), নারী ২৩ জন (১.৫%)। নারীদের সংখ্যা কম হলেও সামাজিক কলঙ্ক ও পরিবারিক চাপের কারণে অনেক অভিযোগ অজানা থেকে গেছে। বছরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে ১০টি গুম, ২০১০ সালে ৩৪, ২০১১ সালে ৪৭, ২০১২ সালে ৬১, ২০১৩ সালে ১২৮, ২০১৪ সালে ৯৫, ২০১৫ সালে ১৪১, ২০১৬ সালে ২১৫, ২০১৭ সালে ১৯৪, ২০১৮ সালে ১৯২, ২০১৯ সালে ১১৮, ২০২০ সালে ৫১, ২০২১ সালে ৯৫, ২০২২ সালে ১১০, ২০২৩ সালে ৬৫ ও ২০২৪ সালে ৪৭টি। ২০১২ সালের পর গুমের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে ২০১৮ সালের মধ্যে উচ্চমাত্রায় পৌঁছায়। নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে এ ঘটনার সম্পর্ক স্পষ্ট। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন সতর্ক করেছে, সরকারি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত ঘটনার চিত্র হতে পারে আংশিক। ভুক্তভোগী ও নিখোঁজদের অধিকাংশই ছাত্র ও যুব সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন, যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয় তরুণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে ছিলেন।