ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রধান বিরোধী নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ নতুন রাষ্ট্রনীতির রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন। সোমবার (৫ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলাকে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র এবং জ্বালানি সম্পদের কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। মাচাদো দাবি করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়েছে এবং এটি আইনের শাসন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় আঞ্চলিক অপরাধচক্র দমনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে, একই সঙ্গে বাজার উন্মুক্তকরণ ও বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষার মাধ্যমে জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো হবে। তিনি আরও বলেন, বিদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো ভেনেজুয়েলাবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের পূর্ণ ম্যান্ডেট অর্জনের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা মাচাদো অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বের সমালোচনা করলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক শাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ঘটনার পর লাতিন আমেরিকা ঘিরে নতুন করে কড়া বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার (৪ জানুয়ারি) রাতে ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কলম্বিয়া ও কিউবার সরকারকে উদ্দেশ্য করে কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সরাসরি আক্রমণ করে অভিযোগ করেন, দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার হচ্ছে এবং বর্তমান সরকার বেশিদিন টিকবে না। কলম্বিয়ায় ভেনেজুয়েলার মতো সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি ‘শুনতে খারাপ নয়’। কিউবা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটি অর্থনৈতিকভাবে পতনের পথে এবং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই বর্তমান সরকার ভেঙে পড়তে পারে। তার দাবি, ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় কিউবার জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহায়তার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগে ফেডারেল আদালতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এসব ঘটনার পর ট্রাম্পের বক্তব্য লাতিন আমেরিকায় নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটন–কারাকাস উত্তেজনার মধ্যে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক পদক্ষেপ ও ভিডিও প্রকাশ। হোয়াইট হাউসের সরকারি ‘র্যাপিড রেসপন্স’ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে, যা ‘পার্প ওয়াক’—অর্থাৎ অপরাধীকে জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নেওয়ার দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ভিডিওতে কালো হুডি পরা মাদুরোকে একটি করিডোর দিয়ে হাঁটতে দেখা যায়, যেখানে নীল কার্পেটে যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ডিইএর নিউইয়র্ক শাখার নাম লেখা ছিল। ভিডিওটির শিরোনামে লেখা হয়, ‘পার্প ওয়াক সম্পন্ন হয়েছে’। এ সময় মাদুরোকে সেখানে উপস্থিত একজনকে ‘শুভ নববর্ষ’ জানাতেও দেখা যায়। সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে। এর মধ্যেই ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের খবর সামনে এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার গভীর রাতে মার্কিন হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সামরিক সদস্য উভয়ই রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভেনেজুয়েলান কর্মকর্তার প্রাথমিক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাকাস বিমানবন্দরের পশ্চিমে কাতিয়া লা মার এলাকায় একটি তিনতলা আবাসিক ভবনে যুদ্ধবিমান হামলা চালানো হয়। এতে ৮০ বছর বয়সী রোজা গঞ্জালেজসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। হামলায় উইলম্যান গঞ্জালেস নামে এক ব্যক্তি আহত হন এবং তাঁর বাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরেক প্রতিবেশী ৭০ বছর বয়সী জর্জ জানান, এই হামলায় তিনি সর্বস্ব হারিয়েছেন। বিবিসি জানিয়েছে, মাদুরোকে আটক করার উদ্দেশ্যে চালানো অভিযানে কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ, আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে। যাচাই করা ভিডিও অনুযায়ী, অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে লা কারলোতা বিমানঘাঁটি, ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক স্থাপনা, পোর্ত লা গুয়েরা বন্দর, হিগুয়েরোতে বিমানবন্দর এবং মিরান্ডা অঙ্গরাজ্যের এল ভলকান টেলিকম টাওয়ার। এই ঘটনাগুলো ভেনেজুয়েলা সংকটকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর মাইক লি জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এখন মার্কিন সেনাদের হেফাজতে আছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি অভিযোগে বিচার হতে পারে। লি বলেন, মার্কো রুবিও তাকে জানিয়েছেন যে মাদুরোকে ভেনেজুয়েলায় আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি এই কর্মকাণ্ডকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের ‘প্রকৃত বা আসন্ন আক্রমণ থেকে রক্ষা করার’ ক্ষমতার আওতায় পড়তে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেন, মাদুরো ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।