শিরোনাম

ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুস নিয়ে গবেষণা করে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছেন এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী

ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুস নিয়ে গবেষণা করে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছেন এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী

 

শতদল তালুকদার, সিডনি থেকে>
বায়ুদূষণ, ধূমপান এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে বিশ্বজুড়ে ফুসফুসের রোগ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, সিওপিডি (COPD) এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মানব ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কৃত্রিমভাবে পুনরুদ্ধার করার এক অভিনব গবেষণা প্রকল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।

এই গবেষণা উদ্যোগের অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির (UTS) সিনিয়র লেকচারার ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা। তাঁর জন্ম বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় । তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দল ভারতের মর্যাদাপূর্ণ SPARC (Scheme for Promotion of Academic and Research Collaboration) কর্মসূচির আওতায় এক কোটি রুপিরও বেশি গবেষণা অনুদান অর্জন করেছে।

গবেষণার মূল ধারণা হলো মানুষের ফুসফুসে ক্ষতিগ্রস্ত সিলিয়ার পরিবর্তে কৃত্রিম সিলিয়া ব্যবহার করা। সিলিয়া হলো শ্বাসনালীর অভ্যন্তরে অবস্থিত অতি সূক্ষ্ম চুলের মতো গঠন, যা শ্বাসনালী থেকে ধূলিকণা, জীবাণু এবং মিউকাস অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন রোগের কারণে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতা দেখা দেয়। গবেষকরা মনে করছেন, কৃত্রিম সিলিয়া প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

প্রকল্পটিতে ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (NIT) রায়পুর, মতিলাল নেহরু ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি, কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ResMed-এর গবেষকরা একসঙ্গে কাজ করবেন। এই বহুজাতিক গবেষণা দল পরীক্ষামূলক গবেষণা, উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশন এবং বায়োমেডিক্যাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির ভিত্তি গড়ে তুলতে চায়।

ড. সুভাষ সাহার মতে, ভবিষ্যতের চিকিৎসা প্রযুক্তিতে প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই প্রকল্পে সেই সমন্বয়ের একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে কৃত্রিম সিলিয়ার কার্যকারিতা, মিউকাস পরিবহনের দক্ষতা এবং বিভিন্ন রোগাবস্থায় এর সম্ভাব্য ব্যবহার পরীক্ষা করা হবে।

গবেষণা মূল্যায়নকারী বিশেষজ্ঞরাও প্রকল্পটিকে অত্যন্ত উদ্ভাবনী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, মানব ফুসফুসে কৃত্রিম সিলিয়া সংযোজনের ধারণা এখনো বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এই গবেষণার সফলতা ভবিষ্যতে শ্বাসতন্ত্রের রোগ চিকিৎসায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

দুই বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে আন্তর্জাতিক গবেষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, উন্নত গবেষণা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা সরঞ্জাম বা থেরাপিউটিক ডিভাইস উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা কম্পিউটেশনাল বায়োফ্লুইড মেকানিক্স, শ্বাসতন্ত্রের প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং তাপ সঞ্চালন গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। তিনি দীর্ঘ দিন যাবত শ্বাসনালীতেফুসফুসে প্লাস্টিক, সিগারেট স্মোক, ও ভাইরাস কণার সঞ্চয়ন ও তার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। এ ছাড়াও অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায় কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার (CPAP) এবং বাই-লেভেল পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার (BiPAP) থেরাপির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন, ড্রাই পাউডার ইনহেলার (DPI)-এর নকশার অপ্টিমাইজেশন, এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য হাই-ফ্রিকোয়েন্সি অসিলেশন (HFO) থেরাপির সম্ভাবনা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি একাধিকবার বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান অর্জন করেছেন। তাঁর এই নতুন সাফল্য শুধু বাংলাদেশের জন্য গর্বের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণাটি সফল হলে ভবিষ্যতে লক্ষ লক্ষ শ্বাসতন্ত্রের রোগীর চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণের এই সংযোগই প্রকল্পটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর