আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলের ফেসবুক থেকে নেওয়া।
নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো।
২০১৫ সনের ১০ জুন আমি আমার স্ত্রীকে বিয়ের জন্য দেখতে যাই। এ প্রসঙ্গে পড়ে আসছি।
আমি জেলে যাওয়ার পরই আব্বা অসুস্থ হয়ে যায়। পুলিশের বেপরোয়া খারাপ ব্যাবহার আমার অনিশ্চিত মুক্তি এ প্রেসারগুলো আব্বা নিতে পারেননি।আমি জেলে থাকতেই আমার আব্বা অসুস্থ হয়ে যান। দীর্ঘদিন দিন পর জেল থেকে বের হয়ে সুস্থ রেখে যাওয়া আমার আব্বাকে আমি বেশ ভালো রকমের অসুস্থ অবস্থায় পাই।বারবার ডাক্তার দেখানোর পরও সুস্থ হচ্ছিলেন না।বাসায় তখন শুধু আব্বা আম্মা ই থাকতেন।আমি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে চেষ্টা করেছি যতটুকু সম্ভব ভালো চিকিৎসা করানোর। আব্বা কষ্ট হলেও বুঝতে দিতেন না।অনেক সময় জোর করেও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া যেতনা। এরমধ্যেই আব্বার স্ট্রোক হয় যা উনি বা আমরা বুঝতে পারিনি।খুবই চাপা স্বভাবের একজন ধার্মিক মানুষ ছিলেন আমার আব্বা। যখন আর খাবার খেতে পারতেন না তখন আমরা বুঝতে পারি এবং উনিও হাসপাতালে ভর্তি হতে রাজি হোন।
হাসপাতালে নলের মাধ্যমে তরল খাবার দিতে হতো বেলায় বেলায় নিয়মিত। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে একটু ভালো করে ডাক্তারদের পরামর্শে বাসায় নিয়ে আসতাম।আবার অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নিয়ে যেতাম।এভাবে কয়েকমাস চলার পর শমরিতা হাসপাতালের এমডি ডাঃ হারুন সাহেবের সহায়তায় বাসাকেই হাসপাতাল বানিয়ে আব্বার চিকিৎসা করতে লাগলাম । হাসপাতাল বেড নার্স চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ সবাই চলতে লাগলো বাসায় থেকেই।
এর মধ্যে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলকে চীন সরকারের আমন্ত্রণে সেখানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আমাকেও সেই টিমে অন্তর্ভুক্ত করেন।দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম বিদেশ সফর আমার জন্য বেশ আকর্ষণীয় হলেও আব্বা অসুস্থ থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না কি করবো। আমার পাসপোর্ট সহ প্রয়োজনীয় সকল কাগজ চেয়ে পাঠালেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.আবদুল মঈন খান। আমিও সংশয় নিয়ে সব কিছু পাঠানোর পর অনেক ভেবে আব্বা অসুস্থ হলেও উনার সাথে বিষয়টি আলাপ করলাম। আমি তখন উনার চোখের আড়াল হলেই জোরে জোরে আমাকে ডাকতেন আর সামনে গেলেই শান্ত হয়ে যেতেন।আমাকে চোখের আড়াল হতে দিতেন না।আর তাই আমাট যাওয়ার কথা শুনে উনার মন ভিষণ খারাপ হয়ে যাওয়াও বুঝতে পারলাম উনার এ অবস্থায় আমি যাই উনি চাচ্ছেন না যদিও মুখে কিছু বললেন না। আমি আর আগপাছ না ভেবে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাডামকে জানালাম যে আব্বার শারীরিক এ অবস্থায় আমি যেতে চাচ্ছি না।আমার বদলে যেন অন্য কাউকে পাঠান।ম্যাডামও বললেন ঠিক আছে তুমি তোমার আব্বার খেয়াল রাখো আমি অন্য কাউকে প্রতিনিধি দলে পাঠাচ্ছি। কিছুদিন পর ছাত্রদলের নতুন কমিটি হয়। তার কিছুদিন পর আমার শিক্ষক আমার সবচেয়ে প্রিয় একজন মানুষ আমার আব্বা আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যান।সেদিন ছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।
আব্বা মারা যাওয়ার পর উনাকে গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে দাফন করি।দাফন করার কয়েকদিন পর উনার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল আয়োজন করে ঢাকায় ফিরে আসি।বাসায় তখন আমি আর আম্মা। ২/৩ দিন পর ম্যাডাম আমাকে ডেকে পাঠান উনার কার্যালয়ে। আমি যাওয়ার পর উনি মমতা ভরা কন্ঠে আব্বার ইন্তেকালের জন্য আফসোস করেন এবং উনার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।আমাকেও সন্তানের মতো সান্ত্বনা দেন।এরপর ম্যাডাম আমাকে বললেন সামনে কর্মসূচি দেওয়া হবে তোমাকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। আমি বললাম আমিতো এখন আর ছাত্রদলের দায়িত্বে নেই তাই আমি কতটুকু করতে পারবো। ম্যাডাম বললেন আমি জানি তোমার সাথে ফোর্স আছে তুমি তাদের কাজে লাগাবে আর মহানগর বিএনপি ও অংগসংগঠনের সাথে সমন্বয় রাখতে বললেন। আমিও উনার নির্দেশ পালন করার জন্য আমার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলাম। আব্বা মারা গেছেন ১৫ দিনও যায়নি আম্মা বাসায় একা শোক বিহবল। আমি ম্যাডামের নির্দেশ পালনের জন্য যোগাযোগ শুরু করে দেই। ২০১৫ সালের প্রথম সপ্তাহে ম্যাডামকে চেয়ারপারসন কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে ফ্যাসিস্ট হাসিনা শুরু হয় আন্দোলন। আমিও আম্মাকে একা বাসায় রেখে প্রয়োজনের তাগিদে বাসা ছেড়ে আত্মগোপনে থেকে কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করি।সকালে গাড়ি নিয়ে বের হতাম বিভিন্ন পয়েন্টে নেতাকর্মীদের সাথে দেখা করে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে রাতে বিভিন্ন স্থানে থাকা শুরু করলাম।এভাবে অবরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করতে লাগলাম জানুয়ারী থেকে এপ্রিল - মে পর্যন্ত। সে সময়ের কাজ বাস্তবায়নে কি ধরনের দুঃসাহসিকতা লাগতো তা শুধু যারা করেছে তারাই জানতো। আর এদিকে আম্মার সাথে শুধু ফোনে কথা হতো।দেখা করতে যেতে পারতামনা। আম্মাও আমাকে সাহস দিতেন, বলতেন তুমি সাবধানে থেকো আমার জন্য চিন্তা করো না। এভাবে একসময় কর্মসূচি স্লো হয়ে যায়।
জুন মাসে হঠাৎ একদিন আম্মা ফোনে বললেন তোর বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাবো তোকেও যেতে হবে।আমি হেসে আম্মাকে বললাম আমি তো আত্মগোপনে থাকি এ অবস্থায় কিভাবে যাবো।আম্মা বললেন আমার দুই ভাই সহ উনারা মেয়েদের বাড়িতে যাবেন আমি যেন সেই ঠিকানায় চলে আসি।আমি বললাম ঠিক আছে আমি আসবো তবে মেয়েদের পরিবার ছাড়া আর কেউ যেন না জানে। জানলে পুলিশ এসে ঝামেলা করবে। আম্মাও বললেন ঠিক আছে কাউকে জানাবেন না। সে অনুযায়ী আমি আমার গোপন স্থান থেকে আর আম্মা এবং ভাইরা বাসা থেকে রওয়ানা হয়ে পথিমধ্যে একসাথে হয়ে মেয়েদের বাসায় যাই দেখার জন্য। দিনটি ছিল আজকের ১০ জুন সাল ২০১৫। জায়গাটি ঢাকার বাহিরে হওয়ায় আমরা সেখানে ঠিকঠাক মতোই পৌঁছে যাই।দেখার ফর্মালিটিস সেরে আমি আবার আত্মগোপনে চলে যাই আর পরিবারের সদস্যরা বাসায়। এরপর মেয়ে পক্ষ যেদিন বাসায় আসে মেয়ে পক্ষকে বুঝতে না দিয়ে আমি তার কিছুক্ষণ আগে বাসায় আসি এবং ফর্মালিটিস সেরে মেয়ে পক্ষ যাওয়ার পরপরই আমি বাসা থেকে বের হয়ে আমার গন্তব্যে চলে যাই। দুই পক্ষের সম্মতিতে কাবিনের সিদ্ধান্ত হয়।কাবিনের দিনও আমি আমার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে রওয়ানা হই আর কাছের কিছু আত্মীয় স্বজন নিয়ে আমার পরিবারের সদস্যরা রওয়ানা হোন। বিয়ে পড়ানোর পরও আমি ফিরে এসে আমার নির্ধারিত স্থানে চলে যাই আর পরিবারের সদস্যরা বাসায়। আমার বিয়েটা এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চারাস ছিল। বাই দ্যা ওয়ে আমি আমার স্ত্রীকে আমি রাজনীতি করি, আমার নামে মামলা আছে, আমি জেলে ছিলাম আমি ভবিষ্যতেও রাজনীতি করবো এগুলো ক্লিয়ার বললেও মামলার সংখ্যা জানতে চাইলেও না বলে এড়িয়ে গেছি। এবং আমি যে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাকে দেখতে গিয়েছি সেটাও বলিনি।আমার স্ত্রীর পরিবারের কেউ রাজনীতি করে না। তারা আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সংখ্যা এবং আমি আত্মগোপনে থাকি শুনলে ভরকে যেতে পারে এই আশংকায় এড়িয়ে গিয়েছি বা সত্য গোপন করেছি।
চলবে