অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কাছে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন শপথ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে পারেন, যা আগামী সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বা মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। একই দিনে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও শপথ নেওয়া হতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জানায়, নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পর আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন। তবে তাঁর পদত্যাগের পর শপথ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে থাকায় বিকল্প সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও জটিল।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়টি শুধু প্রক্রিয়াগত নয়, এবারের নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান অনুচ্ছেদ ১২৩(৩) অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, এবারের নির্বাচন সেই কাঠামোর বাইরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্যে শপথ অনুষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন সম্ভব, যা দলগুলোর সম্মতিতে তিন দিনের অপেক্ষা ছাড়াই আয়োজন করা যেতে পারে।
তফসিল অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর সরকার পতনের পর ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে যায়। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং ২৯৭টির বেসরকারি ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। দুই আসনের গেজেট উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় স্থগিত। ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০৯ আসনে জয়ী এবং তাদের মিত্ররা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন ও তাদের জোটের শরিকরা ৯টি আসনে জয়লাভ করেছে।
প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব শেষের পরও আন্তর্জাতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকবেন ড. অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, উপদেষ্টারা দেশের গর্বিত সন্তান হিসেবে সরকারি দায়িত্বের বাইরে থেকেও দেশের কল্যাণে কাজ চালিয়ে যাবেন। তিনি আরও জানালেন, আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথ অনুষ্ঠানে উপদেষ্টারা পতাকাবাহী গাড়িতে যাবেন এবং অনুষ্ঠান শেষে তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। শফিকুল আলম ভোট ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাফল্যকে ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ আখ্যায়িত করে বললেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, আনসার ও সশস্ত্র বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সফল হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের জন্য প্রধান উপদেষ্টা সরাসরি ১৭টি কেন্দ্রে বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সংযুক্ত ছিলেন।
সরকার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে ড. শেখ আব্দুর রশীদ-এর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে ড. শেখ আব্দুর রশীদের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার মূখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া-কে। ড. শেখ আব্দুর রশীদ বিসিএস ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে চুক্তিভিত্তিকভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে দুই বছরের জন্য তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। অভিনন্দন বার্তায় প্রফেসর ইউনূস বলেন, জনগণের সুস্পষ্ট রায় দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী পথে এগোবে, এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার প্রজ্ঞা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কার্যকর হবে। প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশের বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অর্থনৈতিক রূপান্তর, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জলবায়ু সহনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সুসংগঠিত নেতৃত্ব অপরিহার্য। তিনি তারেক রহমানের জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ়করণ, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন। বার্তার শেষ অংশে প্রফেসর ইউনূস তারেক রহমানকে দেশের মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সাফল্য কামনা করেছেন এবং আল্লাহর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন।