নরসিংদী থেকে আজকের প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধের অভিযোগের পাহাড় উঠেছে। এলআর (লোকাল রিলেশন্স) ফান্ডের নামে নিরীক্ষাবিহীন অর্থ সংগ্রহ করে ইচ্ছে মতো ব্যয়, এল এ শাখায় ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অগ্রিম ২০ পার্সেন্ট গ্রহণ ও সরকারী দলের নেতাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলা এবং ডিসির সরকারি বাসভবনে নিয়মিত তাঁর সহধর্মিণীর নামে প্রতি মাসে গড়ে ১ থেকে দেড় লাখ টাকার পণ্য কেনার অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগ এখন ভাসছে জেলাপ্রশাসন কার্যালয়ের আকাশে বাতাসে। এতে করে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে চলছে নানা মুখরোচক আলোচনা।
তবে, এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের কাছে গতকাল শনিবার সকালে জানতে চাইলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনিত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“আসলে আমাকে অনেক কাজ করতে হয়। সবাই আমার আচরণে বা কাজে সন্তুষ্ট হবে এমন আশা করাও ঠিক না। এছাড়া আমার সহকর্মীদের অনেকেরই অনেক প্রত্যাশা থাকে। সবকিছু রক্ষা করা সম্ভব হয় না। এতে করে ক্ষিপ্ত হয়ে অনেকে আপনাকে অনেক কিছু বলতে পারে।”
কুরিয়ার সম্পর্কে বলেন,
“নরসিংদী আসার পর আমার বাসায় সর্বোচ্চ চার পাঁচটি কুরিয়ার এসে থাকতে পারে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জেলা প্রশাসনে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী এ প্রতিবেদককে জানান,
“জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়মিত বিরতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ী, বিত্তবানশালী, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা বা অনুদান হিসেবে এই তহবিলের নামে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি হরিলুট করে আসছেন।”
অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা তাঁর ইচ্ছানুযায়ী বা মৌখিক নির্দেশে এই অর্থ আদায় করার পর সে অর্থ এল আর ফান্ডে জমা না দিয়ে সোজা তার পকেটে চলে যায়।
যদিও সংগৃহীত টাকা সাধারণত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিশেষ ভিআইপিদের আপ্যায়ন এবং মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হওয়ার কথা। এই হরিলুটের কারণে সম্প্রতি এল আর ফান্ডের করুণ অবস্থার কথা জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের কর্মরত কর্মচারী ও কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি কর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,
“জেলা প্রশাসকের সহধর্মিণীর নামে প্রতি মাসে গড়ে ১ থেকে দেড় লাখ টাকার পণ্য আসে বলে জানা গেছে।”
একজন সরকারি কর্মকর্তার নিয়মিত পারিবারিক ব্যয়ের সঙ্গে এই বিপুল অঙ্কের কেনাকাটা কতটুকু সংগতিপূর্ণ, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫টি পার্সেল জেলা প্রশাসকের বাংলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়। বাংলোর সামনে আসেন নাজির আব্দুর রউফ। তিনি তা গ্রহণ করে টাকা দিয়ে দেন।
এসব পার্সেলে দামী পোশাক, প্রসাধনী ও গৃহসজ্জার সামগ্রী থাকে। অধিকাংশ কেনাকাটাই ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ বা নগদে পরিশোধ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নাজির আব্দুর রউফের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“গত সপ্তাহে একটা কুরিয়ার এসেছে। এটা ডিসি স্যারের মিসেসের নয়, এটা আমার, এমন দাবি করেছেন তিনি। তবে কুরিয়ারের স্থানীয় ডেলিভারি ম্যান এ প্রতিবেদককে জানান, বাংলোতে যত কুরিয়ার আসে তার নম্বর দেওয়া হয় নাজিরের। ডেলিভারির আগে ফোন করলে নাজির সাহেব ডিসি স্যারের বাংলোর সামনে আসতে বলেন। পরে বাংলোর সামনে থেকে তিনি প্যাকেট রিসিভ করে বাংলোর ভিতরে নিয়ে যান। প্যাকেট খুলে পণ্য পছন্দ হলে পরে টাকা দিলে আমরা চলে আসি। আসলে ভিতরে কে রিসিভ করে বা দেখে তা আমরা জানি না।”
নরসিংদী জেলা বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতাকর্মী এ প্রতিবেদককে জানান, বিএনপির প্রতি এই ডিসির অ্যালার্জি আছে। মনোনয়ন দাখিলের সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। যদিও সরকার গঠনের পর তার আচরণের কিছুটা পরিবর্তন হওয়ার কথা জানান বিএনপি নেতারা। তবে তিনি মৌলবাদী সংগঠনের আশীর্বাদপুষ্ট বলে মনে করেন বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতা।
এল এ শাখার সাইফুল ও নাঈমের মাধ্যমে শতকরা ২০ ভাগ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করা হয়। এ ঘটনার সাথে এল এ ও মুন্নি ইসলাম ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একাধিক অভিযুক্ত এ প্রতিবেদককে জানান,
“টাকা না দিয়ে এখান থেকে চেক নেয়া কোনো ভাবেই সম্ভব না।”
এদিকে দুই ভুক্তভোগী স্বীকার করেন, তাদেরকে টাকা না দেওয়ায় গত দেড় বছর ধরে তারা জমি অধিগ্রহণের টাকা পেলেও স্থাপনার বিল পাচ্ছেন না। সরাসরি এল এ অফিসের সাইফুল ও নাঈম ২০ পার্সেন্ট টাকা চেয়েছেন। টাকা না দেওয়ায় তাদের চিহ্নিত দালাল দিয়ে একের পর এক অভিযোগ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ভাবে হয়রানি করে আসছে।
কয়েকবার আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এ অভিযোগের নিষ্পত্তি হলেও সর্বশেষ আবেদন তামাদি করে রাখে। পরবর্তীতে পুনরায় আবেদন করার পর চেক দিচ্ছি-দিব বলে নানা তাল-বাহানা শুরু করে। এক পর্যায়ে গত ঈদের আগে চেক প্রদানের কথা জানায়। কিন্তু ঘুষের টাকা না দেয়ায় আবার চেক দিতে অনীহা প্রকাশ করে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহমুদা বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান,
“চেক লিখব এমন সময় আদালত থেকে একটি আইনি আদেশ এসেছে৷ তাই এখন আর চেক দেয়া যাচ্ছে না।”
এর বেশী কিছু তিনি বলতে অপারগতা প্রকাশ করে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলতে বলেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনর প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এই সিন্ডিকেটের বেড়াজাল থেকে নরসিংদী জেলাবাসী মুক্ত হবে এমন প্রত্যাশাই ভুক্তভোগীদের।
জাতীয় সংসদে বিরোধী মতামত ও সংশোধনী নিয়ে আলোচনার সময় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহকে সংযত থাকার আহ্বান জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাসের পর সংশোধনী সংক্রান্ত আলোচনায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্পিকার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করেন। স্পিকার তার রুলিংয়ে বলেন, সংসদ কোনো বিক্ষোভ বা জনসমাবেশের স্থান নয়; এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে ধৈর্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা আবশ্যক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতের সংসদগুলোর তুলনায় বর্তমান সংসদ তুলনামূলকভাবে অধিক সহযোগিতামূলক পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে এবং সরকারি–বিরোধী সমঝোতার মাধ্যমে বহু বিল পাস হয়েছে। এ সময় তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে সংযত আচরণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন, যাতে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন থাকে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেছে। রায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একজন আসামিকে খালাস এবং অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দোলন দাবি করেছেন, মামলার উপস্থাপিত প্রমাণে গুলির উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জব্দকৃত আলামত ও মরদেহে কোনো গুলির চিহ্ন বা ক্ষত পাওয়া যায়নি এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী ১২ বোর শর্টগানের কার্টিজ ব্যবহারের দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রতিরক্ষা পক্ষ একাধিক আইনি যুক্তি আদালতে উপস্থাপন করেছে বলে জানান তিনি। আইনজীবী দোলন বলেন, আসামিপক্ষের পক্ষে ২০টিরও বেশি পয়েন্টে লিখিত যুক্তি দাখিল করা হয়েছে। তবে প্রত্যাশিত রায় না পাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ বুধবার (৮ এপ্রিল) সংসদে উত্থাপিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশ বিল-২০২৬ সর্বসম্মত কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, সরকার এখন কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে সন্ত্রাসে জড়িত থাকলে নিষিদ্ধ করতে পারবে। অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কার্যক্রম প্রচারও প্রতিরোধ করা যাবে। এছাড়া, নিষিদ্ধ সংগঠন বা দলকে অর্থ, আশ্রয় বা সহায়তা প্রদানে কঠোর শাস্তির বিধান জারি হয়েছে। উল্লেখ্য, এই আইনের প্রাথমিক সংস্করণ গত বছরের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকার দ্বারা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। তখন সংসদ কার্যকর না থাকায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে তা কার্যকর করা হয়েছিল। নতুন পাসকৃত বিল এখন সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে সাহায্য করবে।