ইরানে চলমান সামরিক অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৬ জনে দাঁড়িয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক ও শিশু রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে অন্তত ২১০ জন শিশু এবং ১ হাজারের বেশি বেসামরিক ব্যক্তি রয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক সদস্যের মৃত্যুর তথ্যও নিশ্চিত করা হয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ধারাবাহিক হামলা চলমান থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে এ ধরনের প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, চলমান সংঘাত অব্যাহত থাকলে হতাহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত অবসানে বৈশ্বিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে অনাগ্রহী অবস্থান বজায় রেখেছে—যা আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আল-মনিটরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বেইজিং বর্তমান সংঘাতকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এটি দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে আবদ্ধ থাকবে—যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারে পরোক্ষ সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিলেও কার্যত নিরপেক্ষ কূটনৈতিক ভাষায় সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অনুরোধেও দৃশ্যমান কোনো সক্রিয় মধ্যস্থতায় এগোয়নি। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস ও মজুদের ওপর নির্ভর করে বেইজিং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে চীন একদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ‘দায়িত্বশীল শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কৌশল অবলম্বন করছে। সার্বিকভাবে, চলমান সংঘাত চীনের জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে—যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনীহা প্রতিফলিত হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশই এই যুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করেছেন এবং মনে করছেন, সংঘাতটি কৌশলগতভাবে ইসরায়েলের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক। ‘ডেটা ফর প্রগ্রেস’ পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে আপত্তি জানিয়েছেন এবং কংগ্রেসের মাধ্যমে নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জরিপ বিশ্লেষণে আরও উঠে আসে, চলমান সংঘাতের প্রভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েল-সমর্থন কমানোর প্রবণতা লক্ষণীয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই জনমত পরিবর্তন ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে এবং চলমান সামরিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রতিফলন পড়ছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিদ্যমান নীতিগত অবস্থানে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেননি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পরমাণু অস্ত্র উন্নয়ন থেকে বিরত থাকার যে দীর্ঘদিনের নীতি তেহরান অনুসরণ করে আসছে, তা আপাতত বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান এখনো দেশটির নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে উদ্বেগ ও জল্পনা তৈরি হয়েছে, তারই প্রেক্ষিতে এ মন্তব্য এসেছে। উল্লেখ্য, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পূর্বে একটি ধর্মীয় ফতোয়ার মাধ্যমে পারমাণবিক ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সাম্প্রতিক সামরিক হামলায় তাঁর মৃত্যুর পর সেই নীতি বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিলেও আরাঘচির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তেহরান আপাতত পূর্ববর্তী নীতিতেই অবিচল থাকতে চায়। তবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক নীতির বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।