মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রিয়াদে ইসলামিক দেশগুলোর এক সম্মেলনের সাইডলাইনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, সম্ভাব্য একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কৌশলগত সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্ষমতা সমন্বয়ের মাধ্যমে বর্তমান সংকট মোকাবিলার উপায় খোঁজা হচ্ছে।
তিনি স্পষ্ট করেন, প্রস্তাবিত উদ্যোগটি ন্যাটো-ধাঁচের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা জোট নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, যা সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পরিচালিত সামরিক কার্যক্রম এবং এর জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়াসহ সামগ্রিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় আইনানুগ ও কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে যৌথ পদক্ষেপের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভ্লাদিমির পুতিন। মস্কোয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট জানান, প্রয়োজন হলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পরিবহন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত রয়েছে মস্কো। পুতিন বলেন, ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে রাশিয়া ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের কাজ সম্পন্ন করেছিল এবং সেই অভিজ্ঞতা আবারও কাজে লাগানো সম্ভব। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ঘিরে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একসময় ইরান থেকে ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়াম শুধুমাত্র মার্কিন ভূখণ্ডে স্থানান্তরের শর্ত আরোপ করলে আলোচনায় জটিলতা তৈরি হয় এবং তেহরানও অবস্থান কঠোর করে। রুশ প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন, মস্কো ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে এবং চলমান উত্তেজনার শান্তিপূর্ণ সমাধান দ্রুত সম্ভব হবে। তবে পুতিনের এ প্রস্তাবের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান।
ওমান উপসাগরে ট্যাংকারে হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইরানি তেলবাহী জাহাজ বা বাণিজ্যিক নৌযানে নতুন করে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটি ও ‘শত্রুপক্ষের জাহাজ’ লক্ষ্য করে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক হামলার ঘোষণা দিয়েছে বাহিনীটি। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করে, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের জবাবে ইরান ‘কঠোর প্রতিক্রিয়া’ জানাতে প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধ ও সামরিক তৎপরতাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে পারস্য উপসাগরে নৌ চলাচল নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবেই পাল্টা সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পরিস্থিতি ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও উভয় পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার বাইরে অবস্থান করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি শক্তি প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরানের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি এলাকায় মার্কিন স্বার্থ বা ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজে হামলা হলে ইরানকে “চরম পরিণতি” ভোগ করতে হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক উপস্থিতির ওপর জোর দিয়ে জানান, প্রয়োজনে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগে ওয়াশিংটন দ্বিধা করবে না। একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করা হতে পারে। তার দাবি, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপের মুখে ইরান তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে, তবে কোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথকে কেন্দ্র করে এমন কঠোর বক্তব্য আন্তর্জাতিক বাজার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।