মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি হলে অচলাবস্থায় থাকা এই সমুদ্রপথ খুব শিগগিরই উন্মুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
সোমবার (২৩ মার্চ) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, প্রণালিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যৌথ নিয়ন্ত্রণের ধারণা নিয়েও আলোচনা চলছে। তার ভাষায়, বিষয়টি পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এটি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, চলমান সংলাপ সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনা তৈরি করছে এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি, তবুও আলোচনার অগ্রগতি পরিস্থিতিকে একটি সম্ভাব্য সমাধানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বর্তমানে চলমান যুদ্ধের বহুমুখী চাপ এবং এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলা করতে কষ্ট হচ্ছে, এমনই মন্তব্য করেছেন হোয়াইট হাউস কলামিস্ট নিয়াল স্ট্যানেজ। দ্য হিলের বিশেষজ্ঞের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জনগণের ক্রোধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। স্ট্যানেজ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজছেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো হতে পারে কৌশলগত ধাপ্পাবাজি বা খুব শীঘ্রই নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তুতি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ভোট-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সামরিক কৌশলগত অবস্থান সমন্বয় ঘটানো—এই দ্বিমুখী চাপে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট ও ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবকে মিলিয়ে আরও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল। সোমবার (২৩ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে এক মিডিয়া ইভেন্টে তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিরল বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার পাশাপাশি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ৯টি দেশের ৪০টি তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণে দৈনিক তেলের সরবরাহ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে, যা সত্তরের দশকের সংকটের তুলনায় দ্বিগুণ। একই সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ঘনমিটার কমেছে। আইইএ প্রধান আরও বলেন, পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক “বৃহৎ হুমকি” এবং এই সংকটের মাত্রা অনেকের কাছে সঠিকভাবে বোঝা যায়নি। তাই সংস্থাটি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে জরুরি মজুদ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এবং দূরবর্তী কাজ, কারপুলিং বৃদ্ধি ও যানবাহনের গতিসীমা কমানোর মতো সাশ্রয়ী পদক্ষেপের সুপারিশ দিয়েছে। তবুও বিরলের মতে, সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা, কারণ এটি বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করে। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন, আর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। বর্তমানে এই স্ট্র্যাটেজিক জলপথে কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজই চলাচল করছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর পরিকল্পিত সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান ‘গঠনমূলক’ কূটনৈতিক সংলাপের ধারাবাহিকতায় পাঁচ দিনের জন্য এ স্থগিতাদেশ কার্যকর করা হয়েছে। সোমবার (২৩ মার্চ) দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, এই বিরতি চলমান সংঘাতে উত্তেজনা প্রশমনের একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকায় আলোচনার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে সংঘাত তীব্রতর হওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এই সাময়িক স্থগিতাদেশ কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।