শিরোনাম
বন্ধ হোক শিবির নেতা জিসানদের অপহরণ নাটক

মিথ্যা, প্রতারণা আর স্বার্থের দুনিয়ায় মানুষ কোথায় দাঁড়াবে?

মিথ্যা, প্রতারণা আর স্বার্থের দুনিয়ায় মানুষ কোথায় দাঁড়াবে?
শিবির নেতা ধর্ষক জিসান

সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি এগিয়েছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, মানুষের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। পৃথিবী যেন আগের চেয়ে আরও দ্রুতগতির হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজে বেড়েছে আরেকটি বিষয়—অবিশ্বাস। চারপাশে তাকালে দেখা যায়, অনেক মানুষ সত্যের চেয়ে মিথ্যাকে সহজ মনে করছে, সততার চেয়ে প্রতারণাকে লাভজনক ভাবছে। নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করতেও অনেকেই দ্বিধা করছে না।

সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধানের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণ এবং পরে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ ওঠার পর তিনি আত্মগোপনে যান এবং অপহরণের দাবি করলেও তদন্তে সেই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান এবং আদালতের রায়ই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।

ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত বা আইনি বিষয় নয়; এটি সমাজের একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরে। কারণ এমন ঘটনা মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়—আমরা কি ধীরে ধীরে মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি?

বিশ্লেষকদের মতে, সমাজে যখন অর্থ, ক্ষমতা ও বাহ্যিক সাফল্যই প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন অনেকেই নৈতিকতাকে গৌণ মনে করতে শুরু করে। দ্রুত লাভের আশায় মানুষ ভুল পথ বেছে নেয়। কিন্তু সেই লাভ সাময়িক হলেও এর ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী। মিথ্যা ও প্রতারণা শুধু একজন ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি পুরো সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

একসময় মানুষের কথার মূল্য ছিল। প্রতিবেশীর প্রতি আস্থা, বন্ধুত্বের প্রতি বিশ্বাস এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা সামাজিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করত। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই জায়গা দখল করছে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা। ফলে মানুষ একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সামাজিক বন্ধনও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও সমাজের মধ্যেই রয়েছে। পরিবর্তনের শুরু হতে পারে ব্যক্তি থেকেই। একজন মানুষ যখন সত্যকে ধারণ করে, অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে এবং নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কল্যাণের কথাও ভাবতে শেখে, তখন সে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের শিক্ষা দিলেই হবে না; তাদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্র হিসেবেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

একই সঙ্গে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যায় করে কেউ যদি বারবার পার পেয়ে যায়, তাহলে সমাজে অসততার প্রবণতা বাড়ে। বিচারহীনতা অন্যায়ের অন্যতম বড় প্রেরণা। তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সমাজে আস্থা ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চাও মানুষের বিবেককে জাগ্রত রাখতে সহায়তা করে। যখন মানুষ নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতে শেখে, তখন সে অন্যের ক্ষতি করার আগে অন্তত একবার ভাবতে বাধ্য হয়।

পৃথিবী থেকে মিথ্যা, লোভ কিংবা প্রতারণা হয়তো কখনো পুরোপুরি দূর হবে না। কিন্তু সত্য, সততা ও মানবিকতার চর্চা বাড়লে অন্ধকারের মধ্যেও আলোর পথ তৈরি হবে। সমাজকে বদলানোর জন্য সব মানুষের প্রয়োজন নেই; কিছু মানুষও যদি দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের পথে দাঁড়ায়, তাহলে সেই পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।

মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিবেক। সেই বিবেক জাগ্রত থাকলেই মিথ্যা ও প্রতারণার এই সময়েও মানবিকতা বেঁচে থাকবে। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে সমাজের মুক্তি ও পরিত্রাণের প্রকৃত পথ।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর