শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল কনটেন্ট, ভার্চুয়াল ল্যাব, স্মার্ট বোর্ডসহ নানা আধুনিক পদ্ধতির সংযোজনে পাল্টে যাচ্ছে শেখার ধরণ। সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে স্কুল-কলেজে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে উৎসাহিত করছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র বলছে, সুবিধার চেয়ে চ্যালেঞ্জই যেন বেশি চোখে পড়ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের কাছে।
করোনাকালে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসই হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের প্রধান আশ্রয়। এরপর থেকেই দেশজুড়ে বাড়তে থাকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিধি। ডিজিটাল কনটেন্ট, মোবাইল অ্যাপ, ভিডিও টিউটোরিয়াল, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এখন অনেক শিক্ষার্থীর নিত্যসঙ্গী।
ঢাকার এক বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী অনিক সাহা জানায়,
“ইউটিউব বা অ্যাপ থেকে আমরা এখন অনেক সহজে কঠিন বিষয় বুঝতে পারি। বাসায়ও শিখে ফেলার সুযোগ থাকে।”
শিক্ষক ও অভিভাবকরাও মনে করছেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রযুক্তি শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে এই সুবিধা এখনো দেশের শহর-কেন্দ্রিক একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্ট ডিভাইস বা বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সমস্যায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার এক শিক্ষক বলেন,
“আমাদের স্কুলে ডিজিটাল বোর্ড আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ থাকে না নিয়মিত। শিক্ষার্থীদের অনেকেই স্মার্টফোন পর্যন্ত চালাতে জানে না।”
শুধু ইন্টারনেট নয়, একাধিক সরকারি স্কুলে দেখা গেছে শিক্ষকরা নিজেরাও প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে ক্লাসে ইচ্ছা থাকলেও ডিজিটাল উপায় কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় প্রবেশযোগ্যতার অভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে। কেউ স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির নেট নিয়ে ক্লাস করছে, কেউ আবার বই-খাতা জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ স্কুলে পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নেই। আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫০ শতাংশেরও বেশি এখনো নিয়মিত ই-লার্নিং সুবিধা পায় না।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় একদিকে যেমন ভিডিও, অ্যানিমেশন, কোয়িজের মাধ্যমে শেখা সহজ হয়েছে, অন্যদিকে ডিজিটাল আসক্তি, মনোযোগহীনতা এবং সময় অপচয়ের আশঙ্কাও বেড়েছে।
মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, অনলাইন শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীরা অনেক সময়েই গেম বা সামাজিক মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ে। এতে শেখার মনোভাব তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন,
“প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, দিকনির্দেশনা ও নিয়ম না থাকলে এটি আশীর্বাদ নয়, শিক্ষার জন্য প্রতিবন্ধকতাও হতে পারে।”
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষকদের প্রস্তুতির ঘাটতি। এখনো দেশের বেশিরভাগ শিক্ষক ভিডিও কনটেন্ট তৈরি, ভার্চুয়াল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে প্রশিক্ষিত নন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর পরিধি ও গভীরতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। অনেক শিক্ষক শুধু দেখানোর জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, বাস্তবে তা শিক্ষার্থীর উপকারে আসছে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ করলেই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, যেখানে প্রযুক্তি হবে মাধ্যম, উদ্দেশ্য নয়।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক নীতিমালায় শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে কনটেন্ট তৈরি ও ব্যবহারবিধি ঠিক করতে এখনো কোনো সর্বজনীন নির্দেশনা নেই।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় রমজান মাসজুড়ে ছুটি ঘোষণা হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে পরবর্তী ১০টি শনিবার ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক মো. অয়নাল আবেদীন স্বাক্ষরিত পরিপত্রের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের তথ্য জানানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন। পরিপত্রে বলা হয়েছে, রমজান মাসে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তাই রমজানের ছুটির পরে বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান কার্যক্রম চালু রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার নিবন্ধনপত্রে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। বোর্ডের নিবন্ধিত প্রায় ৬৯ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩৯ হাজার ছেলে থাকলেও তাদের সবার নিবন্ধনপত্রে লিঙ্গ হিসেবে ‘Female’ উল্লেখ করা হয়েছে। কলেজগুলোতে নিবন্ধনপত্র বিতরণের সময় বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে। ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন জেলার কলেজে ছেলেদের কার্ডেও ‘Female’ লেখা দেখে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, বোর্ডের ডাটাবেসে ভুল সেটিংসের কারণে এই ত্রুটি ঘটে এবং তা যাচাই না করেই হাজার হাজার নিবন্ধনপত্র মুদ্রণ করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বোর্ডের অ্যানালিস্ট এস এম শহিদুজ্জামানের গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বোর্ড চেয়ারম্যান ড. ইউনুস আলী সিদ্দিকী বলেন, কম্পিউটার প্রোগ্রাম সেটিংস ও অপারেটরের অসাবধানতার কারণে এই ভুল হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে এবং নিবন্ধনপত্র পুনর্মুদ্রণের কাজ চলছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, নতুন সেটিংস করে নিবন্ধনপত্র সংশোধন করা হচ্ছে। কয়েক হাজার কার্ড ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে এবং বাকি কাজ দ্রুত শেষ করা হবে। এদিকে শিক্ষাবিদদের মতে, নিবন্ধনপত্রে মৌলিক তথ্য যাচাই না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে।
নবগঠিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি-এর প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. এ এস মো. আবদুল হাছিব। আগামী চার বছরের জন্য তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর ১১(১) ধারায় এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, উপাচার্য হিসেবে যোগদানের আগে তিনি তার মূল পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা পাবেন এবং বিধি অনুযায়ী অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে উপাচার্যকে সার্বক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর যেকোনো সময় এই নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন। উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে সমন্বিত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনতে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অনুমোদন করেন।