ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের ভূখণ্ডের এক ইঞ্চিও শত্রুর দখলে যেতে দেবে না এবং যে কোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভাষণে পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, দেশের মাটি ও পানি রক্ষার দায়িত্ব সবার, এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান যে কোনো বহিরাগত হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম। তিনি জানান, ইরান প্রতিবেশী ও ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে কিছু বাহ্যিক শক্তি অঞ্চলটিতে বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আরও বলেন, কিছু আক্রমণ অন্য দেশের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হলেও তেহরান সরাসরি সেই দেশের সঙ্গে বিবাদে জড়িত নয়। তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে কেউ আগ্রাসন চালালে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে।
ভাষণের সমাপনীতে পেজেশকিয়ান দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান, এবং বলেন, জনসাধারণের ঐক্য ও শক্তিই ইরানকে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে রক্ষা করবে।
ইসরায়েলি হামলার পর ইরানের রাজধানী তেহরানে অস্বাভাবিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। শহরের আকাশ ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়ার পর রোববার (৮ মার্চ) সকালে বাসিন্দারা ‘কালো বৃষ্টি’ প্রত্যক্ষ করেছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত হয় শনিবার সন্ধ্যায়, যখন ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের একটি জ্বালানি তেলের গুদাম ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করে। হামলার পর ওই এলাকায় আগুন ও ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব রাজধানীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রোববার সকালে ঘুম থেকে উঠে রাজধানীর বিপুল সংখ্যক বাসিন্দা আকাশ থেকে অস্বাভাবিক রঙের বৃষ্টিপাত দেখতে পান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির পানিতে কালচে দাগ ও তেলজাতীয় পদার্থের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের তেহরান প্রতিনিধি ফ্রেড প্লিটজেন ঘটনাস্থল থেকে জানান, “এখানে যে বৃষ্টি হচ্ছে তা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বৃষ্টির পানি কালচে এবং দেখতে তেলমিশ্রিত বলে মনে হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, হামলার পর রাজধানীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, যে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে সেগুলো থেকে সামরিক ও বেসামরিক খাতে জ্বালানি সরবরাহ করা হতো। তবে এই হামলার ফলে পরিবেশগত ক্ষতি বা জনস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবের আকাশসীমায় একাধিক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার (৮ মার্চ) বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত রাজধানী রিয়াদের পূর্বাঞ্চলীয় আকাশে অন্তত সাতটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সরকারি সূত্র জানায়, এর প্রায় এক ঘণ্টা আগে একই এলাকায় আরও আটটি ড্রোন ধ্বংস করার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে ধারাবাহিকভাবে এসব ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। এর আগে গত শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঘোষণা করেছিলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক অভিযান না চালালে তেহরান পাল্টা হামলায় যাবে না। তবে ওই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানি ভূখণ্ডে হামলার ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান সৌদি আরবসহ আশপাশের অঞ্চলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকায় বেশিরভাগ ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। এ পর্যন্ত এই হামলায় প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে ঘিরেই মূলত এই উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করছে। ইরানের পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে, তারা সম্ভাব্য সংঘাতের পরিণতি থেকে মুক্ত থাকবে না। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে এবং উত্তেজনা প্রশমনে আন্তর্জাতিক মহল কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সব ধরনের বিমান ও যাত্রী সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রী, এয়ারলাইন্স ক্রু ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যার প্রভাব বিমান ও পর্যটন সেবাতেও পড়েছে।