আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি দুঃখপ্রকাশ করেছেন ইরানের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। শনিবার দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, যেসব দেশে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, তাদের উদ্দেশে তেহরান দুঃখ প্রকাশ করছে এবং ইরানের কোনো উদ্দেশ্য নেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর।
রাষ্ট্রীয় সূত্রে প্রচারিত বক্তব্যে পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, ইরান কেবল তখনই প্রতিক্রিয়া জানাবে যখন তার ভূখণ্ড বা স্বার্থের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ হবে। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর একটি অংশ প্রাথমিক আক্রমণের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে দেশটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার নিহত হওয়ায় কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামো বিঘ্নিত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, যদিও কিছু রাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ তুলে ধরেছে ইরান।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেজেশকিয়ানের বক্তব্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে দাবি করেছেন, এটি ইরানের ‘আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত’। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিমান হামলার চাপের মধ্যেও কোনো রাষ্ট্রের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ সাধারণত বাস্তবসম্মত নয় এবং এ ধরনের বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার অংশ হতে পারে।
বর্তমানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ নিহত হওয়ার পর একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির ভেতরে নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা ও মতবিরোধও বাড়ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, পেজেশকিয়ানের দুঃখপ্রকাশ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের আগে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার কৌশল—এই তিনটির সমন্বয় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
জাতিসংঘের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানকে সহ-সভাপতি নির্বাচিত করা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ওয়াশিংটন এই নির্বাচনের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে একে এনপিটি চুক্তির চেতনার পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে পালন করেনি এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতাও নিশ্চিত করেনি। অপরদিকে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা অবস্থান নিয়েছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক চুক্তি বিষয়ে মন্তব্য করার নৈতিক ও আইনি অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নেই; বরং ইতিহাসে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নজির থাকা দেশ হিসেবে ওয়াশিংটনের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, এ বিরোধ এনপিটি কাঠামোর ভেতরে বিদ্যমান আস্থার সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনকে নতুন করে সামনে এনেছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নতুন শান্তি-প্রস্তাব প্রেরণ করেছে ইরান, যেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে পাকিস্তান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ধাপে ধাপে সংঘাত নিরসন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার কাঠামো নির্ধারণের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবের প্রথম ধাপে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং ইরান ও লেবানন-এ ভবিষ্যতে কোনো সামরিক আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-কে। দ্বিতীয় ধাপে, সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ সম্মত হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী-এর নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনায় অগ্রসর হওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। তৃতীয় ধাপে, পূর্ববর্তী দুই স্তরে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে প্রস্তাবের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করা হলে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করে। সংস্থাটির মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস জানান, বিষয়টি সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনার অন্তর্ভুক্ত এবং এ ধরনের ইস্যু গণমাধ্যমে প্রকাশযোগ্য নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলা হয়, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তি হতে হবে মার্কিন স্বার্থ-সুরক্ষামূলক এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার নিশ্চয়তাসম্পন্ন। উল্লেখ্য, এর আগে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ সময়ের বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। পরবর্তীতে পুনরায় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যক্ষ বৈঠকের বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিকল্প যোগাযোগপদ্ধতির ইঙ্গিত দেয়। সাম্প্রতিক এই প্রস্তাবকে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে একটি নতুন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা, যদিও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পারস্পরিক আস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে, যেখানে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে গুরুতর অধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, সদে তেইমান আটককেন্দ্র-সহ কয়েকটি বন্দিশিবিরে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মানবাধিকার সংগঠন বি’সেলেম, ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান মানবাধিকার মনিটর এবং প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস-এর প্রতিবেদনেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। সংস্থাগুলোর দাবি, এসব কেন্দ্র ধীরে ধীরে নিয়মিত আটককেন্দ্রের সীমা অতিক্রম করে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে, যার উদ্দেশ্য বন্দিদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া। অন্যদিকে জাতিসংঘ-এর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনাকে গভীর উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের ওপর জোর দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত, দায় নিরূপণ এবং আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।