মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সর্বশেষ অভিযানে হাইপারসনিকসহ মোট চার ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল ও অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি আইআরজিসির বরাতে জানায়, এ হামলাটি ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) পরিচালিত ৩৪তম দফার ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান। এতে তিন ধরনের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির কাছে অবস্থিত আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জুফায়ার এলাকায় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। এছাড়া ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি ও হাইফার বেসামরিক বিমানবন্দরেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি গোপন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনাতেও আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। তবে এসব হামলার ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন সূত্র থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ১১তম দিনে রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। গত রোববার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি জানিয়েছেন, এখন থেকে ইরান শুধু সেসব মিসাইল ব্যবহার করবে, যেগুলোর পেলোড বা গোলাবারুদ বহন ক্ষমতা ১ হাজার কেজি বা তার বেশি। এই ঘোষণা যুদ্ধের ময়দানে সংখ্যা কমানোর পরিবর্তে ‘বিধ্বংসী ক্ষমতা’ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন সামরিক পর্যবেক্ষকরা। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কৌশল ছিল শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মতো সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করে শত্রুশিবিরের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বা একসঙ্গে প্রচুর ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে ইসরায়েল ও আমেরিকার দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল খরচ করিয়ে ফেলা। তবে এখন ইরান সরাসরি খোররামশাহর-৪ বা খাইবারের মতো ভারী ব্যালিস্টিক মিসাইলের ওপর জোর দিচ্ছে, যা ড্রোনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম। জেনারেল মুসাভি জানান, এই মিসাইলগুলো ম্যাক-৮-এর বেশি গতিতে চলতে পারে এবং এর গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা রয়েছে, যা ইসরায়েলের ‘অ্যারো-৩’-এর মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারবে। একটি এক টনের মিসাইল যদি লক্ষ্যভেদে সফল হয়, তবে তা একটি বিমানঘাঁটি বা ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার অচল করে দেওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে। লেবানিজ সংবাদমাধ্যম ‘আল মায়াদিন’-এর বরাতে জানা গেছে, দুবাই বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের রাস তানুরাজ তৈল শোধনাগারের মতো আঞ্চলিক অবকাঠামো এখন ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। বর্তমানে ইরানের অস্ত্রাগারে ১ হাজার ৮০০ কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম খোররামশাহর মিসাইল রয়েছে, যা ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এছাড়া সলিড ফুয়েলচালিত মাঝারি পাল্লার সেজিল মিসাইল এবং ৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার সুমার ক্রুজ মিসাইলও ইরানের হাতে রয়েছে। সুমার মিসাইল পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক শানাকা আনসেলম পেরেরার মতে, ইরান এখন যুদ্ধের ‘ইন্টারসেপ্ট ম্যাথ’ বা গাণিতিক সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। আগে একটি ড্রোন ধ্বংস করতে ৪ মিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়েট মিসাইল ব্যয় করাটা ছিল অর্থনৈতিক চাপ, কিন্তু এখন ভারী মিসাইল ঠেকাতে ইন্টারসেপ্টর মিসাইল মিস হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এতে আকাশ প্রতিরক্ষাকারীদের দ্রুত ইন্টারসেপ্টর মজুত শূন্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র জবাবে তেহরানের এই ‘হেভি পেলোড’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কার্যকর পরিকল্পনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তেলের দাম কমবে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ সন্তুষ্ট হবে। সোমবার (৯ মার্চ) নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক উত্তেজনার দশম দিনে দেওয়া এ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় তার প্রশাসনের একটি সুস্পষ্ট কৌশল রয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে ইরানের বিরুদ্ধে “২০ গুণ বেশি শক্তিতে” সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেলের প্রবাহ ব্যাহত হলে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে এবং সহজে ধ্বংসযোগ্য কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং চলমান উত্তেজনা নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হতে পারে। দক্ষিণ ফ্লোরিডার ডোরাল এলাকায় নিজস্ব গলফ ক্লাবে হাউস রিপাবলিকান সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এসব মন্তব্য করেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে এবং এ কারণে চীনসহ অন্যান্য দেশগুলোরও এটি ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির মধ্যাঞ্চলের ইয়েহুদ এলাকায় আঘাত হানা ওই হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরানের এ পাল্টা হামলার ফলে ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে নিহত ও আহতদের পরিচয় বা তাদের অবস্থা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক মহল। হামলার ঘটনাগুলোর বিষয়ে তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।