চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার (১৪ মার্চ) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানে স্কুল ও বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় বেইজিং এ জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করবে। ইরানের শাজারাহ স্কুলে হামলায় নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দিতে চীনের রেড ক্রস ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে দুই লাখ মার্কিন ডলার হস্তান্তর করবে।
চীনের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বিবৃতিতে বলেন, “বেসামরিক মানুষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন এবং মানবতা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করেছে।” তিনি আরও বলেন, চীন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, এবং সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে।
এদিকে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শাজারাহ তায়্যিবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৫০ জন স্কুলছাত্রী নিহত হন। ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বর্তমানে ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে, আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি। উত্তরের জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালিতে ইরান তেল পরিবহন সীমিত করেছে, যা বিশ্বের তেল ও এলএনজি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে।
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহরে মার্কিন ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় একই পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে মাত্র ৬ মাস বয়সী একটি শিশু। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা স্থানীয় ইরানি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলা একটি আবাসিক ভবনকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালাচ্ছেন এবং হতাহতদের পরিবারের অবস্থান নিয়ে জরুরি জরিপ কার্যক্রম চলছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় সামরিক ক্ষতি প্রায় ৩.৮৪ বিলিয়ন ডলার পৌঁছালো। চলতি সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে, প্রধান ক্ষতি এসেছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার ধ্বংসের কারণে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও সৌদি আরবে অবস্থিত চারটি থাড রাডারের মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় একটি সতর্কতামূলক রাডারও ধ্বংস হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১.১ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ১১টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে, যার মোট ক্ষতি প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলার। কুয়েতে ভুলবশত ধ্বংস হওয়া তিনটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের ক্ষতি প্রায় ২৮২ মিলিয়ন ডলার। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে, বিমানটির মূল্য প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার। বাহরাইনের মানামায় নৌবাহিনীর সদর দপ্তরেও যোগাযোগ সরঞ্জাম ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩.৮৪ বিলিয়ন ডলার হিসেবে ধরা হয়েছে, যা চলমান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ও স্থাপনা ব্যবস্থার উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের গতিবিধি ও অবস্থান শনাক্তে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা চেয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি দাবি করেছে, বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনাসদস্য বর্তমানে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন হোটেল ও ব্যক্তিগত বাসভবনে অবস্থান করছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভিযোগ করেছে, নিজস্ব সামরিক স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র স্থানীয় আরব নাগরিকদের ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে এসব অবস্থান শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করাকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সাধারণ জনগণকে মার্কিন সেনাদের আশ্রয় না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি যেসব স্থানে তারা অবস্থান করতে পারে, সেসব এলাকার নিকটবর্তী স্থান থেকে দূরে থাকার জন্যও স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে। আইআরজিসি মার্কিন সেনাদের ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকে ‘ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এজন্য নির্দিষ্ট একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে তথ্য পাঠানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ নির্ধারণে ব্যবহার করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে।