চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার (১৪ মার্চ) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানে স্কুল ও বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় বেইজিং এ জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করবে। ইরানের শাজারাহ স্কুলে হামলায় নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দিতে চীনের রেড ক্রস ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে দুই লাখ মার্কিন ডলার হস্তান্তর করবে।
চীনের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বিবৃতিতে বলেন, “বেসামরিক মানুষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন এবং মানবতা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করেছে।” তিনি আরও বলেন, চীন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, এবং সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে।
এদিকে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শাজারাহ তায়্যিবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৫০ জন স্কুলছাত্রী নিহত হন। ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বর্তমানে ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে, আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি। উত্তরের জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালিতে ইরান তেল পরিবহন সীমিত করেছে, যা বিশ্বের তেল ও এলএনজি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে।
হরমুজ প্রণালি ও ইরানের উপকূলীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অবরোধ অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা’ অভিযান চালিয়ে ‘এম/টি স্ট্রিম’ নামের ট্যাংকারটি থামিয়ে দেয়। সেন্টকমের দাবি, জাহাজটি অবরোধ অমান্য করে ইরানের একটি বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ট্যাংকারটি সর্বশেষ মালাক্কা প্রণালিতে দেখা যায়। ঘটনাটিকে এর আগে ‘জলদস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতি’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইরান। তবে এ বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন, দুই পরাশক্তির মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বেইজিং। সোমবার (২৭ এপ্রিল) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতি চীন কখনোই মেনে নেয় না এবং নিজেদের কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ পদক্ষেপে ইরান-সম্পর্কিত অভিযোগে চীনের একাধিক শোধনাগারসহ প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়, যাকে ‘অবৈধ তেল বাণিজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটন। এর জবাবে বেইজিং এসব পদক্ষেপকে ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’ ও ক্ষমতার অপব্যবহার বলে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে, একইসঙ্গে সম্ভাব্য পাল্টা অর্থনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-কেন্দ্রিক জ্বালানি বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
দীর্ঘ প্রায় দুই মাসের স্থবিরতার পর সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় চালু করেছে ইরান, যা আঞ্চলিক আকাশপথ যোগাযোগে আংশিক স্বাভাবিকতা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) থেকে তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর ধাপে ধাপে বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারির পর আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সামরিক পরিস্থিতির কারণে ইরান আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছিল। পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু করা হলেও আন্তর্জাতিক রুটে নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। রাষ্ট্রীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে তুরস্কের ইস্তাম্বুল, ওমানের মাসকাট এবং সৌদি আরবের মদিনাসহ কয়েকটি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক রুট আরও সম্প্রসারণ করা হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।