মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে কোনো সামরিক অভিযানে ফ্রান্স অংশ নেবে না বলে স্পষ্ট করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ফ্রান্সের মন্ত্রিসভার বৈঠকের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, বর্তমান যুদ্ধে ফ্রান্স কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত নয়। সে কারণে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সামরিক পদক্ষেপে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হলে ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে প্যারিস। ম্যাক্রোঁ বলেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং সামরিক হামলা বন্ধ হলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্রান্স প্রস্তুত থাকবে।
এর আগে সোমবার হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ম্যাক্রোঁর অবস্থানকে ‘১০-এর মধ্যে ৮’ নম্বর দিয়ে মূল্যায়ন করেন এবং শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগে যোগ দেবে বলেও প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।
তবে মঙ্গলবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ম্যাক্রোঁ স্পষ্ট করে বলেন, চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার সামরিক অভিযানে ফ্রান্স অংশ নেবে না। একই সঙ্গে ফরাসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে একটি বহুজাতিক জোটের মাধ্যমে ওই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ফ্রান্স।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের (এনসিটিসি) পরিচালক জো কেন্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানো এক পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, ইরানে চলমান যুদ্ধকে তার ব্যক্তিগত বিবেক সমর্থন করে না। চিঠিটি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করা হয়। সেখানে কেন্ট লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান কোনো তাৎক্ষণিক বা আসন্ন নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেনি। তার ভাষায়, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাবশালী লবির চাপের কারণেই এই সংঘাতে জড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জো কেন্টের পদত্যাগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, নিরাপত্তা ইস্যুতে কেন্টের অবস্থান দুর্বল ছিল। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্ট যখন ইরানকে হুমকি নয় বলে মন্তব্য করেন, তখনই তিনি মনে করেন তার পদত্যাগই শ্রেয়। ট্রাম্প আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইরান সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ছিল; এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই হুমকি মোকাবিলায় দেশগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত কি না।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যে মোট ৩৭টি ড্রোন ওই অঞ্চলের আকাশসীমার দিকে ধেয়ে আসে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে ড্রোনগুলো প্রতিহত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এসব ড্রোনের উৎস বা কোন পক্ষ থেকে এগুলো পাঠানো হয়েছে—সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ ঘটনার আগে সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়েতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদির তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনায় তেহরানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তার দাবি, ইরান যদি এমন কোনো অভিযান পরিচালনা করত, তবে তা প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিত। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান টানা ১৭ দিনে গড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরদিকে তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না এবং সংঘাত বন্ধের সিদ্ধান্ত তাদের সার্বভৌম অধিকারের বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান এই উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস শনিবার জরুরি নিরাপত্তা সতর্কবার্তা জারি করে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের তাত্ক্ষণিকভাবে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের শীর্ষ অগ্রাধিকার। দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজনে মার্কিন নাগরিকরা স্থানীয় কনস্যুলেট বা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবেন।