ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ১১তম দিনে রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। গত রোববার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি জানিয়েছেন, এখন থেকে ইরান শুধু সেসব মিসাইল ব্যবহার করবে, যেগুলোর পেলোড বা গোলাবারুদ বহন ক্ষমতা ১ হাজার কেজি বা তার বেশি।
এই ঘোষণা যুদ্ধের ময়দানে সংখ্যা কমানোর পরিবর্তে ‘বিধ্বংসী ক্ষমতা’ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন সামরিক পর্যবেক্ষকরা।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কৌশল ছিল শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মতো সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করে শত্রুশিবিরের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বা একসঙ্গে প্রচুর ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে ইসরায়েল ও আমেরিকার দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল খরচ করিয়ে ফেলা। তবে এখন ইরান সরাসরি খোররামশাহর-৪ বা খাইবারের মতো ভারী ব্যালিস্টিক মিসাইলের ওপর জোর দিচ্ছে, যা ড্রোনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।
জেনারেল মুসাভি জানান, এই মিসাইলগুলো ম্যাক-৮-এর বেশি গতিতে চলতে পারে এবং এর গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা রয়েছে, যা ইসরায়েলের ‘অ্যারো-৩’-এর মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারবে। একটি এক টনের মিসাইল যদি লক্ষ্যভেদে সফল হয়, তবে তা একটি বিমানঘাঁটি বা ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার অচল করে দেওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে।
লেবানিজ সংবাদমাধ্যম ‘আল মায়াদিন’-এর বরাতে জানা গেছে, দুবাই বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের রাস তানুরাজ তৈল শোধনাগারের মতো আঞ্চলিক অবকাঠামো এখন ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে।
বর্তমানে ইরানের অস্ত্রাগারে ১ হাজার ৮০০ কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম খোররামশাহর মিসাইল রয়েছে, যা ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এছাড়া সলিড ফুয়েলচালিত মাঝারি পাল্লার সেজিল মিসাইল এবং ৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার সুমার ক্রুজ মিসাইলও ইরানের হাতে রয়েছে। সুমার মিসাইল পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও সক্ষম বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক শানাকা আনসেলম পেরেরার মতে, ইরান এখন যুদ্ধের ‘ইন্টারসেপ্ট ম্যাথ’ বা গাণিতিক সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। আগে একটি ড্রোন ধ্বংস করতে ৪ মিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়েট মিসাইল ব্যয় করাটা ছিল অর্থনৈতিক চাপ, কিন্তু এখন ভারী মিসাইল ঠেকাতে ইন্টারসেপ্টর মিসাইল মিস হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
এতে আকাশ প্রতিরক্ষাকারীদের দ্রুত ইন্টারসেপ্টর মজুত শূন্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র জবাবে তেহরানের এই ‘হেভি পেলোড’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে গুলিবর্ষণ-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্থানীয় সময় শনিবার (২৫ এপ্রিল) ওয়াশিংটনের একটি হোটেলে সংবাদমাধ্যমের নৈশভোজ চলাকালে গুলির ঘটনা ঘটার পরপরই আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে নিজের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকলেও আতঙ্কিত নন। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, যেখানে বিপদের আশঙ্কা অস্বাভাবিক নয়। পরিস্থিতি নিয়ে হালকা মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ পদটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ আগে জানলে হয়তো তিনি নির্বাচনেই অংশ নিতেন না। তবে পরক্ষণেই তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনই মূল উদ্দেশ্য এবং দেশসেবার অঙ্গীকার থেকেই তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন মেলানিয়া ট্রাম্প। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র সিক্রেট সার্ভিস তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। ট্রাম্প আরও বলেন, ঘটনাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হোটেলটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল না—এ বিষয়টিও পর্যালোচনায় এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, হোয়াইট হাউস সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ওই নৈশভোজ চলাকালীন হঠাৎ গুলির শব্দে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণে আসে।
দীর্ঘ বিরতির পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে গাজা উপত্যকা-এ, যেখানে স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন বাসিন্দারা। শনিবার (২৫ এপ্রিল) রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো গাজার কিছু এলাকায় স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেইর আল-বালাহ শহরকে প্রতীকীভাবে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে অঞ্চলে তাদের প্রশাসনিক উপস্থিতি ও কর্তৃত্বের দাবি আরও সুসংহত করা হচ্ছে। ২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার চর্চা সীমিত ছিল। এবারের নির্বাচনে বিদ্যুৎ সংকট ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কিছু কেন্দ্র তাঁবুতে স্থাপন করা হয়েছে এবং ভোটগ্রহণের সময়ও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ৭০ হাজারসহ মোট ১০ লাখের বেশি ভোটার অংশ নেওয়ার যোগ্য। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে অঞ্চলটির সব এলাকায় ভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি, যার ফলে নির্বাচন আংশিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই স্থানীয় নির্বাচন ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের পথ খুলে দিতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ না থাকায় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে।
আঞ্চলিক সামুদ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঘিরে দ্বিমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে—একদিকে ইরান দাবি করেছে তাদের একটি পণ্যবাহী জাহাজ সফলভাবে নজরদারি এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছে, অন্যদিকে পৃথক অভিযানে একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, চালবাহী জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকালে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-এর নৌ ইউনিটের নিরাপত্তা সহায়তায় ওমান সাগর হয়ে নিরাপদে বন্দরে পৌঁছে। এ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, ভারত মহাসাগরে পৃথক সামরিক অভিযানে ‘ম্যাজেস্টিক এক্স’ নামের একটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয়েছে। পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও তেল পাচার প্রতিরোধে সমুদ্রপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনবোধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।