মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ঘিরে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কৌশলগত বিমান তৎপরতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পারমাণবিক যুদ্ধকালীন কমান্ড ও যোগাযোগ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ডুমসডে প্লেন’-এর একাধিক উড্ডয়নের তথ্য সামনে এসেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর কৌশলগত কমান্ড বিমান Boeing E-6B Mercury-এর একাধিক বিশেষ উড্ডয়ন ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটায় শনাক্ত হয়েছে। এই বিমানগুলো মূলত পারমাণবিক হামলার মতো চরম পরিস্থিতিতে আকাশ থেকে সামরিক কমান্ড পরিচালনা ও প্রতিরোধমূলক নির্দেশনা প্রেরণের জন্য নকশা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় দুটি ই-৬বি বিমানের বিশেষ উড্ডয়ন লক্ষ্য করা যায়। একটি বিমান মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে উড্ডয়ন করে মেরিল্যান্ডের পাটুসেন্ট রিভার নেভাল এয়ার স্টেশনে অবতরণ করে এবং অন্যটি নেব্রাস্কার অফুট এয়ার ফোর্সেস বেস থেকে উড্ডয়ন করে পুনরায় একই ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
বিশ্লেষণে আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, কিছু কৌশলগত বিমান আটলান্টিক অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পেন্টাগন, যা তারা ‘অপারেশনাল সিকিউরিটি’-এর আওতাভুক্ত বলে উল্লেখ করেছে।
এই বিমানগুলো ‘ট্যাকামো’ মিশনের অংশ হিসেবে কাজ করে, যার লক্ষ্য হলো সংকটকালীন পরিস্থিতিতে প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলেও পারমাণবিক কমান্ড ও নির্দেশ যথাযথ স্থানে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বিবেচনায় এই কৌশলগত কমান্ড ব্যবস্থার সক্রিয়তা বাড়ানো হয়েছে বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান ও নিরাপদ যোগাযোগ বজায় রাখার সক্ষমতা থাকায় এই বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কমান্ড কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এর সক্রিয়তা বাড়া সামরিক প্রস্তুতির উচ্চমাত্রাকেই প্রতিফলিত করছে।
ওয়াশিংটনে গুলিবর্ষণ-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্থানীয় সময় শনিবার (২৫ এপ্রিল) ওয়াশিংটনের একটি হোটেলে সংবাদমাধ্যমের নৈশভোজ চলাকালে গুলির ঘটনা ঘটার পরপরই আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে নিজের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকলেও আতঙ্কিত নন। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, যেখানে বিপদের আশঙ্কা অস্বাভাবিক নয়। পরিস্থিতি নিয়ে হালকা মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ পদটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ আগে জানলে হয়তো তিনি নির্বাচনেই অংশ নিতেন না। তবে পরক্ষণেই তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনই মূল উদ্দেশ্য এবং দেশসেবার অঙ্গীকার থেকেই তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন মেলানিয়া ট্রাম্প। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র সিক্রেট সার্ভিস তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। ট্রাম্প আরও বলেন, ঘটনাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হোটেলটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল না—এ বিষয়টিও পর্যালোচনায় এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, হোয়াইট হাউস সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ওই নৈশভোজ চলাকালীন হঠাৎ গুলির শব্দে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণে আসে।
দীর্ঘ বিরতির পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে গাজা উপত্যকা-এ, যেখানে স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন বাসিন্দারা। শনিবার (২৫ এপ্রিল) রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো গাজার কিছু এলাকায় স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেইর আল-বালাহ শহরকে প্রতীকীভাবে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে অঞ্চলে তাদের প্রশাসনিক উপস্থিতি ও কর্তৃত্বের দাবি আরও সুসংহত করা হচ্ছে। ২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার চর্চা সীমিত ছিল। এবারের নির্বাচনে বিদ্যুৎ সংকট ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কিছু কেন্দ্র তাঁবুতে স্থাপন করা হয়েছে এবং ভোটগ্রহণের সময়ও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ৭০ হাজারসহ মোট ১০ লাখের বেশি ভোটার অংশ নেওয়ার যোগ্য। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে অঞ্চলটির সব এলাকায় ভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি, যার ফলে নির্বাচন আংশিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই স্থানীয় নির্বাচন ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের পথ খুলে দিতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ না থাকায় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে।
আঞ্চলিক সামুদ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঘিরে দ্বিমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে—একদিকে ইরান দাবি করেছে তাদের একটি পণ্যবাহী জাহাজ সফলভাবে নজরদারি এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছে, অন্যদিকে পৃথক অভিযানে একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, চালবাহী জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকালে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-এর নৌ ইউনিটের নিরাপত্তা সহায়তায় ওমান সাগর হয়ে নিরাপদে বন্দরে পৌঁছে। এ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, ভারত মহাসাগরে পৃথক সামরিক অভিযানে ‘ম্যাজেস্টিক এক্স’ নামের একটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয়েছে। পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও তেল পাচার প্রতিরোধে সমুদ্রপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনবোধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।