মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) পর্যন্ত টানা ১৩ দিনে গড়িয়েছে। চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। তবে অব্যাহত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও সংঘাত বন্ধের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।
সংঘাতের প্রথম দিনেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা হয়। ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অন্তত ৪৮ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের নেতৃত্বকে অচল করে দিয়ে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করা।
তবে প্রায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধের পরও ইরানের শাসনব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায়নি। ফলে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক কৌশলে নতুন পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ বিবেচনায় নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচিত হলেও কার্যত কৌশলগত নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে শুরুতে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে দায়িত্ব দেওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামো দ্রুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য বিকল্প নেতৃত্ব কাঠামোও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামো ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে জনমনে চাপ সৃষ্টি করার কৌশলও আলোচনায় এসেছে।
ইতোমধ্যে ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি হামলার ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। তবে ক্রমবর্ধমান এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ফের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক সূচক হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও প্রতি ব্যারেল ১০০ মার্কিন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এশিয়ার লেনদেনে দাম প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে BBC–এর লাইভ প্রতিবেদনে। তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ তাদের কৌশলগত মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। Iran হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ না হলে এই প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বৈশ্বিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র এর যৌথ হামলার পর ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। টানা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্য ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত অবসানে তিনটি মৌলিক শর্তের কথা তুলে ধরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানিয়েছেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও যুদ্ধবিরতির পথে অগ্রসর হতে হলে ইরানের ন্যায্য অধিকার স্বীকৃতি, যুদ্ধজনিত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন না করার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। বুধবার (১১ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X (Twitter)–এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব শর্তের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেন, তেহরান বরাবরই আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে; তবে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ইরানের অধিকার ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। পোস্টে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জানান, এ বিষয়ে তিনি রাশিয়া ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত ‘জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা’ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনার ফল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কার্যকর আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর থেকে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি প্রশমনে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হলেও এখনো স্থায়ী সমাধানের পথ সুস্পষ্ট হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ঘিরে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কৌশলগত বিমান তৎপরতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পারমাণবিক যুদ্ধকালীন কমান্ড ও যোগাযোগ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ডুমসডে প্লেন’-এর একাধিক উড্ডয়নের তথ্য সামনে এসেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর কৌশলগত কমান্ড বিমান Boeing E-6B Mercury-এর একাধিক বিশেষ উড্ডয়ন ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটায় শনাক্ত হয়েছে। এই বিমানগুলো মূলত পারমাণবিক হামলার মতো চরম পরিস্থিতিতে আকাশ থেকে সামরিক কমান্ড পরিচালনা ও প্রতিরোধমূলক নির্দেশনা প্রেরণের জন্য নকশা করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় দুটি ই-৬বি বিমানের বিশেষ উড্ডয়ন লক্ষ্য করা যায়। একটি বিমান মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে উড্ডয়ন করে মেরিল্যান্ডের পাটুসেন্ট রিভার নেভাল এয়ার স্টেশনে অবতরণ করে এবং অন্যটি নেব্রাস্কার অফুট এয়ার ফোর্সেস বেস থেকে উড্ডয়ন করে পুনরায় একই ঘাঁটিতে ফিরে আসে। বিশ্লেষণে আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, কিছু কৌশলগত বিমান আটলান্টিক অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পেন্টাগন, যা তারা ‘অপারেশনাল সিকিউরিটি’-এর আওতাভুক্ত বলে উল্লেখ করেছে। এই বিমানগুলো ‘ট্যাকামো’ মিশনের অংশ হিসেবে কাজ করে, যার লক্ষ্য হলো সংকটকালীন পরিস্থিতিতে প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলেও পারমাণবিক কমান্ড ও নির্দেশ যথাযথ স্থানে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বিবেচনায় এই কৌশলগত কমান্ড ব্যবস্থার সক্রিয়তা বাড়ানো হয়েছে বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান ও নিরাপদ যোগাযোগ বজায় রাখার সক্ষমতা থাকায় এই বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কমান্ড কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এর সক্রিয়তা বাড়া সামরিক প্রস্তুতির উচ্চমাত্রাকেই প্রতিফলিত করছে।