চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) পৃথক দুই ঘটনায় একটি এ-১০ মডেলের যুদ্ধবিমান হরমুজ প্রণালির নিকটে পারস্য উপসাগরে বিধ্বস্ত হয় এবং এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের মধ্যাঞ্চলে একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান পতনের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করা হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সামরিক সূত্র অনুযায়ী, দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব হামলা পরিচালিত হয়েছে। একইসঙ্গে অন্তত পাঁচটি মার্কিন হেলিকপ্টারেও আঘাত হানার দাবি করা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ নিশ্চিতকরণ না এলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনা চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে না এবং তিনি একে ‘যুদ্ধের বাস্তবতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের উদ্ধার অভিযানের সময় আরও মার্কিন বিমান ও হেলিকপ্টার হামলার মুখে পড়ে, এতে কয়েকজন ক্রু সদস্য আহত হন।
এদিকে ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাদের ‘উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি’ ব্যবহারের মাধ্যমে এ হামলা সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক দাবির বিপরীত ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দাবি ও সামরিক উত্তেজনা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে দেশটিকে “সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়ার” হুমকি দিয়েছেন। রোববার (৫ এপ্রিল) তিনি এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো শান্তি চুক্তি না হলে ইরান ব্যাপক হামলার মুখোমুখি হবে। ট্রাম্প আরও বলেন, “ইরান তছনছ হয়ে গেছে, প্রতিদিন তাদের সবকিছু পুনর্নির্মাণ করতে হবে—বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, সব কিছু। এর আগে কোনো দেশ এমন ক্ষতির মুখোমুখি হয়নি।” তিনি সময়সীমাও কিছুকাল থেকে “কয়েক দিনের মধ্যে” পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়েছেন, প্রণালী খোলার জন্য ইরানকে সর্তক অবস্থা মেনে চলতে হবে, নাহলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হবে। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এবং মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইরান দাবি করছে, নিখোঁজ মার্কিন সেনা উদ্ধারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। দেশটির আধা-সরকারি ফার্স নিউজ জানায়, ধ্বংস হওয়া বিমানটি মার্কিন বিমান বাহিনীর ‘সি-১৩০’ পরিবহন বিমান ছিল। ইরানের পুলিশ বিশেষ কমান্ডো ইউনিট ফারাজ রেঞ্জার্স অভিযান পরিচালনা করে বিমানটি ধ্বংস করেছে বলে খবরে বলা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছে সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পবিত্র মাতৃভূমি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে। ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানটি তখন এলাকার “আক্রমণকারী শক্তিকে” জ্বালানি সরবরাহের কাজে নিযুক্ত ছিল। ইরান এটিকে অনুপ্রবেশকারী বিদেশি বাহিনীর সহায়তা হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগন থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে নিখোঁজ মার্কিন সেনা উদ্ধারের এই অভিযান ও ভূপাতিত দাবির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে উদ্ধারে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এফ-১৫ই মডেলের যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রাত থেকেই মার্কিন স্পেশাল ফোর্স ইরানের অভ্যন্তরে অনুসন্ধান ও উদ্ধার (কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে বিমানের একজন পাইলটকে উদ্ধার করা হলেও অপর ক্রু সদস্য এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার অভিযানের সময় অতিরিক্ত মার্কিন বিমান ও হেলিকপ্টার ইরানি বাহিনীর হামলার মুখে পড়ে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় একটি এ-১০ যুদ্ধবিমানের পাইলট সাগরে অবতরণে বাধ্য হন এবং পরে তাকে উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে একটি হেলিকপ্টারে গুলিবর্ষণের ঘটনায় কয়েকজন ক্রু আহত হলেও সেটি নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (CSAR) অভিযান অত্যন্ত জটিল ও সময়সংবেদনশীল, যা সাধারণত বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এলিট ইউনিট দ্বারা পরিচালিত হয়। নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধারে অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।