যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দাবি করেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একাধিক মার্কিন প্রশাসনের ওপর ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন।
এক সাক্ষাৎকারে কেরি জানান, তিনি নিজে এমন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন যেখানে নেতানিয়াহু সরাসরি ওয়াশিংটনের কাছে হামলার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তার ভাষ্যমতে, এই প্রস্তাব সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সহ জো বাইডেন এবং জর্জ ডব্লিউ. বুশ প্রশাসনের কাছেও উত্থাপিত হলেও তারা এতে সম্মতি দেননি। তবে কেরির দাবি অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
কেরি আরও উল্লেখ করেন, ইরানে হামলার পক্ষে একটি কৌশলগত প্রস্তাবনায় দেশটির নেতৃত্বকে দুর্বল করা, সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি এবং সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় করার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছিল।
এদিকে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন করে সংকটে পড়লেও, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, স্থায়ী সমঝোতার লক্ষ্যে উভয় দেশ ইসলামাবাদে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে, যা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্ধারিত আলোচনার আগে কড়া শর্ত আরোপ করে অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, পূর্বশর্ত পূরণ না হলে ইসলামাবাদে নির্ধারিত বৈঠক শেষ মুহূর্তে বাতিল হতে পারে। শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে উভয় দেশের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উদ্ধৃতি দিয়ে এক সাংবাদিক জানান, তেহরান পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে—নির্ধারিত ‘রেডলাইন’ অমান্য হলে কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করা হবে না। পারমাণবিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে ইরানি পক্ষ আরও জানিয়েছে, তাদের স্বার্থ ও শর্ত প্রতিফলিত না হলে আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ানোও একটি কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হবে। এর আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, লেবাননে হামলা বন্ধ এবং জব্দকৃত ইরানি সম্পদ ফেরত না দিলে আলোচনার কোনো ভিত্তি থাকবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের বিষয়ে তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। পরস্পরবিরোধী এই অবস্থানের কারণে ইসলামাবাদে সম্ভাব্য আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
আসন্ন কূটনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে ইরানের জব্দ অর্থ মুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিয়েছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। শনিবার (১১ এপ্রিল) দেওয়া এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানায়, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তি হয়নি। এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ ছাড়ে যুক্তরাষ্ট্র নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে এক ইরানি সূত্র দাবি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অর্থ মূলত দক্ষিণ কোরিয়ায় তেল বিক্রির আয়, যা ২০১৮ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর জব্দ করা হয় এবং পরে কাতারের মধ্যস্থতায় একটি বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে স্থানান্তরিত হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী, এসব অর্থ নিয়ে নতুন কোনো ছাড়ের সিদ্ধান্ত হয়নি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে আগামী সপ্তাহে লেবাননের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। তবে এই আলোচনায় হিজবুল্লাহকে কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল লেটার। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহর অব্যাহত হামলা শান্তি প্রক্রিয়ার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে এবং এ সংগঠনকে আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। এদিকে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে টেলিফোনে যোগাযোগ হয়েছে, যেখানে উত্তেজনা প্রশমন ও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির কাঠামো নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। লেবাননের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আসন্ন বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে।