বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থান নিচ্ছে, যার ফলে রাজপথে আবারও বিরোধ ও সংঘাতের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে, যেখানে একদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পুনরায় জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক ধারা অনুসরণে অনড়।
বিএনপি গত সপ্তাহে ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করে যেখানে দলটির শীর্ষ নেতারা স্পষ্টভাবে বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন তারা মানবে না। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে এই সরকারকে বিদায় করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে আমরা রাজপথে থাকবো।” বিএনপি’র নেতারা দাবি করেন, গত দুই নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারণে জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ বলা হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, “বিএনপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও অস্থিরতা তৈরি করতে চায়। তারা জানে, জনগণের সমর্থন তাদের নেই, তাই ষড়যন্ত্র করছে।” তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন যথাসময়ে সংবিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে, কোনো আপস নেই।”
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষক নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও কমিশন জানিয়েছে, তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেন, “আমরা সকল দলকে সমান সুযোগ দেবো। কেউ যদি অংশ না নেয়, সেটা তাদের সিদ্ধান্ত।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপই একমাত্র সমাধান হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফুল হক বলেন, “একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে সব দলের অংশগ্রহণ জরুরি। কিন্তু কোনো দল নির্বাচন বর্জন করলে গণতন্ত্র আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এদিকে দেশের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকেরা স্থিতিশীল পরিবেশ চান। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে ক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া।
আগামী মাসেই নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেবে বিএনপি এবং একাধিক জোট গঠনের আলোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, দলীয় মনোনয়ন, প্রচার কৌশল ও মাঠ পর্যায়ের সংগঠন শক্তিশালী করতে নিয়মিত বৈঠক করছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি আবারো এক নতুন মোড় নিতে চলেছে। এখন দেখার বিষয়, আলোচনার পথে রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব হয় কিনা, নাকি রাজপথই আবার হয়ে ওঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্রবিন্দু।
সংসদীয় আইনানুগ বাধ্যবাধকতার প্রেক্ষিতে একটি আসন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে অনুযায়ী তিনি বগুড়া–৬ আসনটি পরিত্যাগ করে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছেন। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) কমিশনে পৌঁছানো চিঠিতে তিনি ঢাকা–১৭ আসনটি সংরক্ষণের কথা জানান। কমিশন সূত্র জানায়, আইন অনুযায়ী একাধিক আসনে নির্বাচিত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে কেবল একটি আসন গ্রহণ করা যায়; অবশিষ্ট আসন শূন্য ঘোষণা করে সেখানে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হবে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর শীর্ষ নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর বাড্ডায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-এর বাসভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বাসায় প্রবেশের সময় তারেক রহমান নাহিদ ইসলাম ও উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে বুকে টেনে নেন তারেক রহমান। বিএনপি সূত্র জানায়, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক সংলাপের উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুর নবী খান সোহেল, হুমায়ুন কবির এবং চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে এনসিপির পক্ষে সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সারজিস আলমসহ দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া) আসনে ইতিহাস গড়লেন ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি দেশের সর্বকনিষ্ঠ নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে এ আসনে প্রথম নারী এমপি হিসেবেও নিজের নাম লেখালেন তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপির হারানো ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিলেন পুতুল। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আসমা শাহীন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন পুতুল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা) পান ৮৯ হাজার ৪৩১ ভোট। বিজয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় পুতুল মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “এই বিজয় লালপুর–বাগাতিপাড়ার আপামর মানুষের। দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের অক্লান্ত পরিশ্রমই এ সাফল্যের মূল ভিত্তি।” রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেওয়া পুতুল বিএনপি সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, মরহুম ফজলুর রহমান পটল–এর কন্যা। ফজলুর রহমান পটল ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এ আসন থেকে ধারাবাহিকভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নাটোর-১ আসনকে বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছিলেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি হাতছাড়া হয় এবং পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় বিএনপি সেখানে প্রতিনিধিত্বহীন থাকে। বাবার মৃত্যুর পর সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত করলেন পুতুল। তার এ বিজয় কেবল একটি আসন পুনরুদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং প্রজন্মান্তরের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।