করোনা মহামারির সময় থেকেই দেশে অনলাইন ক্লাসের প্রচলন শুরু হয়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির এই প্রয়োগ অনেকটাই জরুরি অবস্থা মোকাবিলার অংশ ছিল। শুরুতে শিক্ষার্থীরা নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে বিষয়টি গ্রহণ করলেও ধীরে ধীরে এর প্রতি আগ্রহ কমতে শুরু করে। এখন দেখা যাচ্ছে, অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতির হার বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন ক্লাস কার্যকর হতে হলে নির্দিষ্ট অবকাঠামো, উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখার কৌশল প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে, দেশের অনেক শিক্ষার্থী এখনো নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা পায় না। আবার অনেকের বাড়িতে নেই প্রয়োজনীয় ডিভাইস, কিংবা থাকলেও তা পরিবারের একাধিক সদস্যের মাঝে ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়। ফলে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ হারানোর অন্যতম কারণ।
শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যাই নয়, অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সরাসরি যোগাযোগ করতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না। অনেক সময় তারা বুঝেও না বোঝার ভান করে ক্লাস শেষ করে দেয়। এতে করে বিষয়বস্তুর প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং শিখনে ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস অনেক সময় একঘেয়েমি ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বেশি সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, ফলে শেখার গতি ব্যাহত হয়।
শিক্ষকদের একাংশ মনে করেন, অনলাইন ক্লাসে পাঠদানের পদ্ধতি এখনও যথাযথভাবে মানসম্মত হয়নি। অধিকাংশ শিক্ষকই শুধু পাঠ্যবই পড়ে শোনান, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করে না। অপরদিকে, অনেক শিক্ষক নিজেরাও প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ নন, ফলে ক্লাস পরিচালনায় তারা দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসে সম্পৃক্ততা কমে যায় এবং তারা পড়াশোনা থেকে ধীরে ধীরে বিমুখ হয়ে পড়ে।
অভিভাবকরাও বলছেন, শিশুদের ঘরে বসে অনলাইনে পড়াশোনায় আগ্রহ ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় তারা মোবাইল বা ল্যাপটপে ক্লাসের নাম করে অন্য কিছুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যা পড়াশোনার ক্ষতি করে। এছাড়া দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে সমস্যা, মানসিক অস্থিরতা ও একাকীত্বও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন হাইব্রিড লার্নিং পদ্ধতি—যেখানে অফলাইন ও অনলাইন উভয় মাধ্যমকে ভারসাম্যের সঙ্গে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া অনলাইন ক্লাসের কনটেন্টকে আরও ইন্টারেক্টিভ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তোলা, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবারও আগ্রহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নয়তো এই ধারাবাহিক শিখন ঘাটতি আগামী দিনে একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও দক্ষতার মানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

