ওয়াশিংটন–নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপড়েন কাটিয়ে আবারও ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত মিলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে। রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পথে অগ্রসর হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি সপ্তাহে ঘোষিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। আদেশে উল্লেখ করা হয়, ভারত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধে অঙ্গীকার করেছে এবং পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পণ্য ক্রয়ে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি আগামী এক দশকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি কাঠামো তৈরিতেও দিল্লি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার কার্যকর হবে। নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় পাল্টা শুল্কের হারও ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ধাপে ধাপে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল বাণিজ্যিক সমঝোতাই নয়, বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার প্রতিফলন। অতীতে ট্রাম্প একাধিকবার মোদিকে তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেরিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ইরানের হাতে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছেন কূটনৈতিক সূত্র। আলজাজিরার প্রতিবেদক ওসামা বিন জাভেদ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রস্তাবটি ইরানিদের কাছে উপস্থাপন করেছেন এবং এখন ইরানের জবাবের প্রতীক্ষা চলছে। একই সূত্র জানায়, আগামী দিনগুলোতে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির পররাষ্ট্র বিষয়ক সহসভাপতি হারুন আরমাগান রয়টার্সকে বলেন, আঙ্কারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ‘বার্তা আদান-প্রদানের ভূমিকা’ পালন করছে। তিনি জানান, এই মধ্যস্থতা উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং সরাসরি আলোচনার পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।
ইরানের তেহরান সরকার মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মাসব্যাপী রণক্ষেত্রীয় সংঘাতের অবসানের জন্য এবার কৌশলগতভাবে পাঁচটি কঠোর শর্ত উত্থাপন করেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে চাইছে, তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ছাড়া কোনো আলোচনায় অংশ নেবে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে— ১. স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: সাময়িক নয়, সম্পূর্ণভাবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হবে না তার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা। ২. হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কার্যত ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ৩. মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার: মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে স্থাপিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি। ৪. আর্থিক ক্ষতিপূরণ: যুদ্ধের কারণে ইরানের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ। ৫. সংবাদমাধ্যম ও শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: বিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত মিডিয়া ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা, প্রয়োজন হলে শত্রুদের হস্তান্তর। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে নিবিড় আলোচনায় রয়েছেন। তবে ইরানের পাঁচ শর্ত কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন এই শর্তগুলোর সঙ্গে রণক্ষেত্রের বাস্তবতার সংমিশ্রণে দুলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বর্তমানে চলমান যুদ্ধের বহুমুখী চাপ এবং এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলা করতে কষ্ট হচ্ছে, এমনই মন্তব্য করেছেন হোয়াইট হাউস কলামিস্ট নিয়াল স্ট্যানেজ। দ্য হিলের বিশেষজ্ঞের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জনগণের ক্রোধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। স্ট্যানেজ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজছেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো হতে পারে কৌশলগত ধাপ্পাবাজি বা খুব শীঘ্রই নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তুতি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ভোট-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সামরিক কৌশলগত অবস্থান সমন্বয় ঘটানো—এই দ্বিমুখী চাপে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।