মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে ইরানের নৌ, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। স্থানীয় সময় ৭ মার্চ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহে পরিচালিত অভিযানে মার্কিন বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের ফলে ইরানের নৌবাহিনীর বহু যুদ্ধজাহাজ ও বিমান অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের বহু রকেট লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে সেগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করা এবং ভবিষ্যতে হামলার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি ইরানের কাছ থেকে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” প্রত্যাশার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
এদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালী এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার (৯ মার্চ) তেহরানে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, সম্প্রতি তুরস্ক, সাইপ্রাস ও আজারবাইজানের দিকে সংঘটিত হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। তিনি এ ঘটনাকে ‘সাজানো কাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং সতর্ক করেছেন, শত্রুপক্ষ ইরান ও অন্যান্য দেশের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য হামলার কাহিনি তৈরি করতে পারে। বাঘাই আরও বলেন, “আমরা বারবার বলেছি, আমরা যুদ্ধ শুরু করিনি বা উসকানি দেইনি। এটি কোনো পছন্দের যুদ্ধ নয়; এটি আমাদের ওপর চাপানো একটি প্রয়োজনের যুদ্ধ।” তিনি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে বলেন, “এই মুহূর্তে কোনো আলোচনা প্রাসঙ্গিক নয়। এখন আমাদের একমাত্র মনোযোগ মাতৃভূমি রক্ষা এবং চলমান সামরিক সংঘর্ষ পরিচালনা।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান স্পষ্টভাবে হামলার বিরুদ্ধে অভিযুক্ত হওয়ার অভিযোগ খণ্ডন করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে যে, পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী গঠনমূলক বা বিভ্রান্তিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।
উত্তর সাইপ্রাসের আকাশসীমায় সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে তুরস্ক তার সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ছয়টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, “অঞ্চলের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কের এই পদক্ষেপ কৌশলগত দিক থেকে আঞ্চলিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং উত্তেজনা মোকাবিলায় নেওয়া একটি প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সোমবার (৯ মার্চ) ভোরে ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বৈঠকের মাধ্যমে তাকে এ পদে নির্বাচিত করা হয়। এই সিদ্ধান্ত আসে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার সাংবিধানিক দায়িত্ব ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ওপর ন্যস্ত। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পরিবর্তনের ঘটনা। এর আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলী খামেনিকে দ্রুততার সঙ্গে এই পদে নির্বাচিত করা হয়েছিল। নতুন নেতা মোজতবা খামেনি, বয়স ৫৬ বছর, প্রয়াত আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র। যদিও তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না, তবুও দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তার প্রভাব রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। বিশেষত দেশটির শক্তিশালী সামরিক সংগঠন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বিশ্লেষকরা তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য, মোজতবা খামেনি উচ্চ পর্যায়ের ধর্মীয় আলেম নন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ অভিযোগ করেছিল, তিনি আঞ্চলিক রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্ষমতার বলয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।