ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সোমবার (৯ মার্চ) ভোরে ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বৈঠকের মাধ্যমে তাকে এ পদে নির্বাচিত করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত আসে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার সাংবিধানিক দায়িত্ব ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ওপর ন্যস্ত।
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পরিবর্তনের ঘটনা। এর আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলী খামেনিকে দ্রুততার সঙ্গে এই পদে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
নতুন নেতা মোজতবা খামেনি, বয়স ৫৬ বছর, প্রয়াত আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র। যদিও তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না, তবুও দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তার প্রভাব রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। বিশেষত দেশটির শক্তিশালী সামরিক সংগঠন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বিশ্লেষকরা তুলে ধরেছেন।
উল্লেখ্য, মোজতবা খামেনি উচ্চ পর্যায়ের ধর্মীয় আলেম নন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ অভিযোগ করেছিল, তিনি আঞ্চলিক রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্ষমতার বলয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
চীনের অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং-এর দুই বছর আগের পূর্বাভাস এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি বেইজিংয়ে দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ে পাঠদান করেন এবং ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’ বা ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইতিহাসের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করেন। জিয়াং ২০২৪ সালের মে মাসে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরবেন এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পথে নামতে বাধ্য হবেন। এছাড়া তিনি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতের ফলে দেশটি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তার ওই অনলাইন বক্তৃতা সামাজিক মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই দুইটি পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হয়েছে—ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার বৃদ্ধি। বাকি তৃতীয় পূর্বাভাসের ফলাফল বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। জিয়াং বিশ্লেষণ করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত কেবল সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবেনা; এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোরও সমালোচনামূলক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। তেহরান-ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাবে এবং বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করবে। তিনি সম্প্রতি ‘ব্রেকিং পয়েন্টস’ সংবাদসিরিজে বলছেন, “ইরান যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এই সংঘাতে বেশি প্রস্তুত এবং সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটি প্রায় দুই দশক ধরে এই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আমার পূর্বাভাস অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে পরাজিত হয়ে রাষ্ট্র হিসেবে ধ্বংস হবে কিনা।” এই বিশ্লেষণ বিশ্বরাজনীতির আগ্রহীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নতুন করে সতর্ক সংকেত দেখাচ্ছেন।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে তেহরান। সোমবার (৯ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি এক বিবৃতিতে জানায়, দেশটির সামরিক বাহিনী নতুন নেতৃত্বের অধীনে এই হামলা পরিচালনা করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত এক পোস্টে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি প্রকাশ করা হয়, যেখানে লেখা ছিল—“আপনার সেবায় প্রস্তুত, সাইয়্যিদ মোজতবা।” এ বার্তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তার স্ত্রী ও মেয়েসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাও প্রাণ হারান বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানানো হয়। এরপর দেশটির সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোজতবা খামেনি। পর্যবেক্ষকদের মতে, তার নেতৃত্বে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের ভূখণ্ডের এক ইঞ্চিও শত্রুর দখলে যেতে দেবে না এবং যে কোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভাষণে পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, দেশের মাটি ও পানি রক্ষার দায়িত্ব সবার, এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান যে কোনো বহিরাগত হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম। তিনি জানান, ইরান প্রতিবেশী ও ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে কিছু বাহ্যিক শক্তি অঞ্চলটিতে বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আরও বলেন, কিছু আক্রমণ অন্য দেশের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হলেও তেহরান সরাসরি সেই দেশের সঙ্গে বিবাদে জড়িত নয়। তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে কেউ আগ্রাসন চালালে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে। ভাষণের সমাপনীতে পেজেশকিয়ান দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান, এবং বলেন, জনসাধারণের ঐক্য ও শক্তিই ইরানকে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে রক্ষা করবে।