মতামত

চার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ!

Icon
পারভীন আফরোজ খান>
প্রকাশঃ এপ্রিল ৫, ২০২৬

 

•    জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট
•    অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি
•    নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য
•    ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি

 
চার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ । এগুলো হলো জ্বালানি স্বল্পতা,অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীত,নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ মূল্য এবং ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ। চলতি এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত এসব ইস্যুগুলো প্রকাশ করা হয়। চলমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং নীতিগত কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-এর আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর  ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা শীর্ষক সংলাপে সম্প্রতি তিনি এ কথা বলেন। 
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে ইতোমধ্যেই ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের ঘাটতিতে ইতোমধ্যে অনেক পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে শিল্প ও পরিবহন খাতে বড় প্রভাব ফেলছে । 

 

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান, সারের উৎপাদন, মজুত ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার স্বার্থে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। 
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়,আগামী ৩ মাস দেশব্যাপী সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গৃহীত কর্মকৌশল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পর্যাপ্তসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংকিং সেবা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।জরুরিসেবা ছাড়া সব অফিস ভবন, বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করতে হবে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আশার কথা হলো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে নতুন কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। এর আওতায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের নিত্যপণ্য বাজার এক অদৃশ্য আগুনে পুড়ছে। প্রতিদিন মানুষ যা দেখছে, তা শুধু পণ্যের দাম নয় একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংকটও। মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ে, সমাজে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা তত বাড়ে।মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক চিত্র হলেও বড় ধরণের মুদ্রাস্ফীতিকে অর্থনীতির জন্য অভিঘাত হিসেবে দেখা হয়। 
দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়ছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা -বানিজ্য, রপ্তানি আয়- কোথাও স্বস্তির খবর নেই। ব্যাংকিং খাত এখনো নড়বড়ে অবস্থায়। এসব বিষয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ, যুদ্ধ, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিনিয়োগ কমায় এবং ভোক্তাদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে । মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়ও কমেছে অনেক। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। রাজস্ব সংগ্রহের এই ধীরগতি ও ঘাটতির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংকুচিত হচ্ছে, ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে সরকার। এর পেছনে কর ফাঁকি, আয়ের বৈষম্য ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা দায়ী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেই ধারা থেকে এখনও বের হতে পারছে না সংস্থাটি। এতে ঘাটতির
পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এতে করে ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থায় সরকার। চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই আদায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়নি, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রতি মাসে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই ঘাটতি মেটাতে এনবিআর-এর করজাল বিস্তার ও কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
পরিবহন খরেচের অজুহাতে ও জ্বালানি তেলের সংকটের ফলে পরিবহন ভাড়া, এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে । উৎপাদন ঘাটতি, আমদানিতে ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে কাঁচাবাজার, মাছ-মাংস ও চাল-ডালসহ সবকিছুর দাম চড়া।জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় ট্রাক ও ভ্যান ভাড়া বেড়েছে, ফলে পণ্য পরিবহনে খরচ ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে । সার, বীজ ও সেচের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে । পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে । টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বড় সমস্যাগুলোর একটি খেলাপি ঋণ। সময়ের সঙ্গে এই সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতেও। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের বড় একটি অংশ রয়েছে শিল্প খাতে, আর এই খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। খেলাপি ঋণ ক্যানসারের মতো আর্থিক খাতকে ক্ষয় করছে, যার ফলে আমানতকারীদের আস্থায় চাপ এবং নতুন বিনিয়োগে শ্লথগতি তৈরি হয়েছে । রাজনৈতিক প্রভাব, বিগত সরকারে আমলে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৌরাত্ম্য এই পরিস্থিতির মূল কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খেলাপির হার এখনো অত্যন্ত বেশি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তবুও এটি আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি। জানা গেছে,  ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ ৫০ কোটি টাকার ওপরে। এসব ঋণে খেলাপির হার ৫১ শতাংশ। ছোট ঋণে খেলাপি মাত্র সাড়ে ২১%।
ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের ধরন ও খেলাপির হার নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যত বড় ঋণ, খেলাপিও তত বেশি। আর ছোট ও মাঝারি ঋণে খেলাপি কম। প্রতিবেদনের তথ্য ও ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নেন। তারপরও তাঁরা সেই ঋণ পরিশোধে অত্যন্ত তৎপর থাকেন। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগ কম। তার বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণে সুদহার থাকে কম। তারপরও বড় ঋণের গ্রাহকেরা কম সুদের সেই ঋণ ফেরতে নানা গড়িমসি করেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা ঋণ পরিশোধ না করে উল্টো নানা ধরনের ছাড় পান।
ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেছেন, এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সংকট তারল্য নয়, বরং উচ্চ খেলাপি ঋণ, যা এক ধরনের ‘ক্যানসারের মতো’ ভিতর থেকে খাতটিকে ক্ষয় করছে।
এদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন ঝুঁকি শনাক্ত করতে তদারকি জোরদার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নিরীক্ষা-সংক্রান্ত অন্তর্বতী প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে।

 

সকল নিরপরাধের মুক্তি চাই

চব্বিশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে টালমাটাল গোটা দেশ। পতিত সরকারের একতরফা দমন-পীড়ন তারুণ্যের বারুদ নেভাতে পারেনি। বরং গর্জে উঠেছে, চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে ৫ আগস্ট। তারুণ্যের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার আর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে গিয়ে দমন-পীড়নের অভিনব ধারা তৈরি করে তারা। মব সন্ত্রাসকে ‌'জাস্টিস' বানিয়ে চাপিয়ে দেয়া হয় শিক্ষক, গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষের ওপর। ডিপ স্টেস্টের এজেন্ডা বাস্তবায়ন, সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মব সন্ত্রাস, টাকা পাচার, প্রশাসনে নিজেদের লোক বসানো, পদায়ন ও রদবদলে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনসহ হাজারও কারণে চব্বিশ এখন এক পতিত ধ্রুবতারার নাম। জাতির সাথে, দেশের সাথে প্রতারণা ছিল কী না-তা নিয়ে আলোচনা চলছে জোরেশোরে।  পরিসংখ্যান বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর 'মব সন্ত্রাস' এর মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এ পর্যন্ত ছয়জন শিক্ষক মারা গেছেন। পাঁচ শতাধিক আহত ও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন ঠিক কতজন-এর কোনও হিসেব নেই।   মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার' এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৭ মাসে 'মব সন্ত্রাস' এ ৪৫ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরেই অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে খুন হয়েছেন ৩৩ জন। আর গণপিটুনিতে গত ১৭ মাসে ১৮১ জন নিহত হয়েছেন।  ঢাকাসহ সারা দেশে নির্বিচার পুলিশ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলা নিষেধ। তাই বললাম না। এবার আসি গায়েবি/ভুয়া/সাজানো মামলা দিয়ে বাণিজ্যের বিষয়ে। হয়রানির এক কালো অধ্যায় শুরু হয় ৫ আগস্টের পর। আপনি কোনদিন রাজনীতি করেননি। গান, কবিতা, আঁকাআঁকি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মনের আনন্দে কী-বোর্ডে সুর তোলেন। আপনি বাসায় আছেন, অথচ আপনার নামে হত্যাচেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়ে গেছে। পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেলো। আদালতে তোলা মাত্র রিমান্ড মঞ্জুর। এরপর থেকে কারাগারে। অপরাধ কী, আপনার বাবা একসময় মন্ত্রী ছিলেন। পতিত দলের রাজনীতি করতেন। বাবার রাজনীতির বলি হতে হচ্ছে সন্তানকে। এভাবেই চলছে, প্রিয় বাংলাদেশ। আর কতদিন চলবে কে জানে! জামিন কী হচ্ছে না? হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলছি, সাবের হোসেন চৌধুরীর কথা। সাবেক এই পরিবেশমন্ত্রীকে হত্যা মামলায় রিমান্ডে পাঠানোর পরদিনই সেটিসহ ছয় মামলায় জামিন দেন আদালত। এটা ০৮ অক্টোবর ২০২৪ এর কথা। বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু নীরবতা ছিল উত্তর। যা বোঝার সবাই বুঝে নিয়েছেন আশা করি। বিস্তারিত আলাপে যাবো না। কারণ, তাকে নিয়ে রাজনীতিতে নতুন সমীকারণের কথা বলা হচ্ছে।  এবার আসি সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিষয়ে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজধানীর লালবাগ থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক স্পিকারকে জামিন দিয়েছেন আদালত। রোববার (১২ এপ্রিল, ২০২৬) আসামি পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের আদালত ৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। সবশেষ, কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগম। বুধবার (২২ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে তারা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে মানবিক বিবেচনায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেছেন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দায়ের করা ১২টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ১৪ আগস্ট, ২০২৫ বৃহস্পতিবার কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীকে। চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৭ অক্টোবর তাকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে।  মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথম, তৃতীয়, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। তিনি ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পরে দশম সংসদে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ শারীরিক নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত। উন্নত চিকিৎসার জন্য মোশাররফ হোসেনকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। ব্যক্তিগতভাবে আমিও মানবিক বাংলাদেশ দেখতে চাই। তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হোক।  দুটি হত্যা মামলায় কারাবন্দি তৃণমূল বিএনপির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। সোমবার (২৪ মার্চ, ২০২৫) ঢাকা কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হন তিনি। চব্বিশের ১৭ অক্টোবর সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মুবিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হওয়ার পরদিন তাকে পল্টন থানায় দায়ের করা যুবদল নেতা শামীম মোল্লা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা পারভেজ মিয়া হত্যা মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয় প্রবীণ এই রাজনীতিবিদকে।  অন্যদিকে, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও ঢাকা-১৫ আসন থেকে চার বারের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কামাল আহমেদ মজুমদার, বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ শরীরে দিন কাটছে কারাগার নির্ধারিত হাসপাতালের বিছানায়। যে বয়সে কোরআন শরীফ পাঠ করা আর নাতি-নাতনির সাথে সময় কাটানোর কথা, যে বয়সে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে জেলখানায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। ক্ষমতায় থাকতেও অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতির প্রতিবাদ করেছেন সংসদে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন। একাত্ম ছিলেন তরুণ প্রজন্মের দাবির আদায়ে। কিন্তু তাতে কি, ছাত্র আন্দোলনে দায়ের করা বেশ কিছু হত্যা মামলায় ২০২৪ বছরের ১৯ অক্টোবর কামাল আহমেদ মজুমদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে মামলার জালে আটকে রাখা হয়েছে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদকে। অন্যদের জামিন দেওয়া হলেও কামাল আহমেদ মজুমদারের মতো রাজনীতিবিদের বেলায় রাষ্ট্রের ন্যায্যতা দেখিনা। মহামান্য বিচারকদের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি আমরা। যে কথা বলছিলাম, কেবলমাত্র বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সন্তান এখন কারাভোগ করছেন। মোহনা টেলিভিশনে কাজ করার সময় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারের ছেলে মোহনা টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহেদ আহমেদ মজুমদারের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাকে। রাজনীতির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। আগ্রহও দেখিনি। নিপাট ভদ্রলোক। সুর, তাল, লয়, আঁকাআঁকি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন সবসময়। সবার সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, সৃজনশীল এই মানুষটি এখন কারাগারে। কারণ আগেই বলেছি, বাবার রাজনৈতিক পরিচয়। বাবা রাজনীতি করতে বলে সন্তানকে জেল খাটতে হবে!  সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জেল আছেন শাহেদ আহমেদ মজুমদার। তার বিরুদ্ধে মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৫ সালের গত ১২ সেপ্টেম্বর দুপুরে গুলশানের ফজলে রাব্বী পার্কের পাশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যানার নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দেন। তারা গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা করে জনমনে ভীতির সঞ্চার করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালানোর চেষ্টা করেন। সেসময় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার ও তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। মামলা বলা হয়, জব্দ করা মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাপের মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রকে ‘অস্থিতিশীল ও অবকাঠামোকে ধ্বংস করতে’ বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে বলে পুলিশ দেখতে পেয়েছে। ২০২৫ সালের গত ১৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানার এসআই মাহাবুব হোসাইন ওই মামলা করেন। এর প্রেক্ষিতে ২৭ সেপ্টেম্বর শাহেদ আহমেদ মজুমদারকে ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।  মামলা যে ষড়যন্ত্রমূলক তা বিবরণ পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন। অন্যদিকে, শাহেদ আহমেদ মজুমদার, বাবা কামাল আহমেদ মজুমদারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব নামে জ্ঞাত-আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৩৯ লাখ ৭৩ হাজার ৭৩৬ অর্জন করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও আরেকটি মামলা করেছেন। দুদকও সঙ্গী হয়েছে তখনকার প্রভাবশালীদের। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা, অপরাধ করলে তার তদন্ত করা হোক। বিচার করা হোক। তবে অন্যায়ভাবে কাউকে মিথ্যে মামলায় হয়রানি করানো, জেল খাটানো, মানসিক নির্যাতন করা, সামাজিকভাবে হেয় করা, সন্তানকে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করা-এটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।  আইনের ছাত্র হিসেবে, একজন সাংবাদিক হিসেবে মনে করি, শাহেদ আহমেদ মজুমদারকে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাতে তার ছোট্ট সন্তান বাবার আদর পাবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীকে পাশে পাবে। অন্যদিকে, মোহনা টেলিভিশনের শত শত কর্মী ফিরে পাবে প্রিয় অভিভাবক। প্রতিহিংসার রাজনীতি আর দেখতে চাই না। চাই না, কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি অকারণে মিথ্যে মামলায় আর জেলে খাটুক। আর প্রশাসনকে যারা প্রভাব খাটিয়ে অপব্যবহার করছেন বা করেছেন; তাদের বিচারেও আওতায় নিয়ে আসা দরকার। না হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, কেবল কথার কথাই থেকে যাবে। বাংলাদেশ হোক সবার প্রত্যাশিত ন্যায় ও সাম্যের বাংলাদেশ।  

শিপন হালদার এপ্রিল ২২, ২০২৬ 0

চার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ!

আমার দেখা সবচেয়ে পরিশ্রমী-নিষ্ঠাবান মানুষ আব্বু : জাইমা

0 Comments