• জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট
• অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি
• নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য
• ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি
চার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ । এগুলো হলো জ্বালানি স্বল্পতা,অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীত,নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ মূল্য এবং ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ। চলতি এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত এসব ইস্যুগুলো প্রকাশ করা হয়। চলমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং নীতিগত কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-এর আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা শীর্ষক সংলাপে সম্প্রতি তিনি এ কথা বলেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে ইতোমধ্যেই ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের ঘাটতিতে ইতোমধ্যে অনেক পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে শিল্প ও পরিবহন খাতে বড় প্রভাব ফেলছে ।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান, সারের উৎপাদন, মজুত ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার স্বার্থে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়,আগামী ৩ মাস দেশব্যাপী সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গৃহীত কর্মকৌশল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পর্যাপ্তসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংকিং সেবা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।জরুরিসেবা ছাড়া সব অফিস ভবন, বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করতে হবে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আশার কথা হলো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে নতুন কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। এর আওতায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের নিত্যপণ্য বাজার এক অদৃশ্য আগুনে পুড়ছে। প্রতিদিন মানুষ যা দেখছে, তা শুধু পণ্যের দাম নয় একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংকটও। মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ে, সমাজে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা তত বাড়ে।মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক চিত্র হলেও বড় ধরণের মুদ্রাস্ফীতিকে অর্থনীতির জন্য অভিঘাত হিসেবে দেখা হয়।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়ছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা -বানিজ্য, রপ্তানি আয়- কোথাও স্বস্তির খবর নেই। ব্যাংকিং খাত এখনো নড়বড়ে অবস্থায়। এসব বিষয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ, যুদ্ধ, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিনিয়োগ কমায় এবং ভোক্তাদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে । মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়ও কমেছে অনেক। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। রাজস্ব সংগ্রহের এই ধীরগতি ও ঘাটতির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংকুচিত হচ্ছে, ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে সরকার। এর পেছনে কর ফাঁকি, আয়ের বৈষম্য ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা দায়ী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেই ধারা থেকে এখনও বের হতে পারছে না সংস্থাটি। এতে ঘাটতির
পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এতে করে ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থায় সরকার। চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই আদায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়নি, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রতি মাসে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই ঘাটতি মেটাতে এনবিআর-এর করজাল বিস্তার ও কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
পরিবহন খরেচের অজুহাতে ও জ্বালানি তেলের সংকটের ফলে পরিবহন ভাড়া, এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে । উৎপাদন ঘাটতি, আমদানিতে ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে কাঁচাবাজার, মাছ-মাংস ও চাল-ডালসহ সবকিছুর দাম চড়া।জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় ট্রাক ও ভ্যান ভাড়া বেড়েছে, ফলে পণ্য পরিবহনে খরচ ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে । সার, বীজ ও সেচের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে । পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে । টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বড় সমস্যাগুলোর একটি খেলাপি ঋণ। সময়ের সঙ্গে এই সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতেও। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের বড় একটি অংশ রয়েছে শিল্প খাতে, আর এই খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। খেলাপি ঋণ ক্যানসারের মতো আর্থিক খাতকে ক্ষয় করছে, যার ফলে আমানতকারীদের আস্থায় চাপ এবং নতুন বিনিয়োগে শ্লথগতি তৈরি হয়েছে । রাজনৈতিক প্রভাব, বিগত সরকারে আমলে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৌরাত্ম্য এই পরিস্থিতির মূল কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খেলাপির হার এখনো অত্যন্ত বেশি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তবুও এটি আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি। জানা গেছে, ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ ৫০ কোটি টাকার ওপরে। এসব ঋণে খেলাপির হার ৫১ শতাংশ। ছোট ঋণে খেলাপি মাত্র সাড়ে ২১%।
ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের ধরন ও খেলাপির হার নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যত বড় ঋণ, খেলাপিও তত বেশি। আর ছোট ও মাঝারি ঋণে খেলাপি কম। প্রতিবেদনের তথ্য ও ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নেন। তারপরও তাঁরা সেই ঋণ পরিশোধে অত্যন্ত তৎপর থাকেন। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগ কম। তার বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণে সুদহার থাকে কম। তারপরও বড় ঋণের গ্রাহকেরা কম সুদের সেই ঋণ ফেরতে নানা গড়িমসি করেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা ঋণ পরিশোধ না করে উল্টো নানা ধরনের ছাড় পান।
ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেছেন, এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সংকট তারল্য নয়, বরং উচ্চ খেলাপি ঋণ, যা এক ধরনের ‘ক্যানসারের মতো’ ভিতর থেকে খাতটিকে ক্ষয় করছে।
এদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন ঝুঁকি শনাক্ত করতে তদারকি জোরদার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নিরীক্ষা-সংক্রান্ত অন্তর্বতী প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে।
• জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট • অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি • নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য • ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি চার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ । এগুলো হলো জ্বালানি স্বল্পতা,অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীত,নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ মূল্য এবং ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ। চলতি এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত এসব ইস্যুগুলো প্রকাশ করা হয়। চলমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং নীতিগত কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-এর আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা শীর্ষক সংলাপে সম্প্রতি তিনি এ কথা বলেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে ইতোমধ্যেই ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের ঘাটতিতে ইতোমধ্যে অনেক পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে শিল্প ও পরিবহন খাতে বড় প্রভাব ফেলছে । শুক্রবার (৩ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান, সারের উৎপাদন, মজুত ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার স্বার্থে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়,আগামী ৩ মাস দেশব্যাপী সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গৃহীত কর্মকৌশল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পর্যাপ্তসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংকিং সেবা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।জরুরিসেবা ছাড়া সব অফিস ভবন, বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করতে হবে। এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আশার কথা হলো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে নতুন কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। এর আওতায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের নিত্যপণ্য বাজার এক অদৃশ্য আগুনে পুড়ছে। প্রতিদিন মানুষ যা দেখছে, তা শুধু পণ্যের দাম নয় একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংকটও। মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ে, সমাজে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা তত বাড়ে।মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক চিত্র হলেও বড় ধরণের মুদ্রাস্ফীতিকে অর্থনীতির জন্য অভিঘাত হিসেবে দেখা হয়। দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়ছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা -বানিজ্য, রপ্তানি আয়- কোথাও স্বস্তির খবর নেই। ব্যাংকিং খাত এখনো নড়বড়ে অবস্থায়। এসব বিষয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ, যুদ্ধ, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিনিয়োগ কমায় এবং ভোক্তাদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে । মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়ও কমেছে অনেক। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। রাজস্ব সংগ্রহের এই ধীরগতি ও ঘাটতির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংকুচিত হচ্ছে, ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে সরকার। এর পেছনে কর ফাঁকি, আয়ের বৈষম্য ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা দায়ী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেই ধারা থেকে এখনও বের হতে পারছে না সংস্থাটি। এতে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এতে করে ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থায় সরকার। চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই আদায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়নি, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রতি মাসে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই ঘাটতি মেটাতে এনবিআর-এর করজাল বিস্তার ও কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পরিবহন খরেচের অজুহাতে ও জ্বালানি তেলের সংকটের ফলে পরিবহন ভাড়া, এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে । উৎপাদন ঘাটতি, আমদানিতে ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে কাঁচাবাজার, মাছ-মাংস ও চাল-ডালসহ সবকিছুর দাম চড়া।জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় ট্রাক ও ভ্যান ভাড়া বেড়েছে, ফলে পণ্য পরিবহনে খরচ ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে । সার, বীজ ও সেচের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে । পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে । টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বড় সমস্যাগুলোর একটি খেলাপি ঋণ। সময়ের সঙ্গে এই সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতেও। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের বড় একটি অংশ রয়েছে শিল্প খাতে, আর এই খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। খেলাপি ঋণ ক্যানসারের মতো আর্থিক খাতকে ক্ষয় করছে, যার ফলে আমানতকারীদের আস্থায় চাপ এবং নতুন বিনিয়োগে শ্লথগতি তৈরি হয়েছে । রাজনৈতিক প্রভাব, বিগত সরকারে আমলে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৌরাত্ম্য এই পরিস্থিতির মূল কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খেলাপির হার এখনো অত্যন্ত বেশি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তবুও এটি আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি। জানা গেছে, ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ ৫০ কোটি টাকার ওপরে। এসব ঋণে খেলাপির হার ৫১ শতাংশ। ছোট ঋণে খেলাপি মাত্র সাড়ে ২১%। ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের ধরন ও খেলাপির হার নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যত বড় ঋণ, খেলাপিও তত বেশি। আর ছোট ও মাঝারি ঋণে খেলাপি কম। প্রতিবেদনের তথ্য ও ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নেন। তারপরও তাঁরা সেই ঋণ পরিশোধে অত্যন্ত তৎপর থাকেন। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগ কম। তার বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণে সুদহার থাকে কম। তারপরও বড় ঋণের গ্রাহকেরা কম সুদের সেই ঋণ ফেরতে নানা গড়িমসি করেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা ঋণ পরিশোধ না করে উল্টো নানা ধরনের ছাড় পান। ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেছেন, এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সংকট তারল্য নয়, বরং উচ্চ খেলাপি ঋণ, যা এক ধরনের ‘ক্যানসারের মতো’ ভিতর থেকে খাতটিকে ক্ষয় করছে। এদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন ঝুঁকি শনাক্ত করতে তদারকি জোরদার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নিরীক্ষা-সংক্রান্ত অন্তর্বতী প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে।