আঞ্চলিক সংঘাতে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগে কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ জোরদার করেছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহায়তার অভিযোগ তুলে উপসাগরীয় পাঁচ রাষ্ট্র—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান—এর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দাবি উত্থাপন করেছে তেহরান।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি এক আনুষ্ঠানিক পত্রে আন্তোনিও গুতেরেস ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে প্রতিপক্ষকে সহযোগিতা করেছে, যার ফলে সৃষ্ট সামরিক সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতির দায় তাদের ওপরও বর্তায়।
পত্রে ইরান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার সংরক্ষণ করে। তবে এ বিষয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিনের উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইরানের বিপুল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনি বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
ইরানের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে বাস্তবসম্মত ও সংযত অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করে কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার তাগিদ দেন। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) চীন সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ল্যাভরভ বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) কখনও নিশ্চিত করেনি যে ইরান সামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। এ অবস্থায় ওয়াশিংটনের উচিত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নীতিগত অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হতে চায়, তবে রাশিয়া সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। আইএইএ সূত্র অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যার সমৃদ্ধতার মাত্রা প্রায় ৬০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধতায় পৌঁছালে তা পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণে ব্যবহৃত হতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচির আড়ালে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে, যদিও তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
হরমুজ প্রণালি-এ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নৌ-অবরোধের চাপের মুখে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত তেলবাহী জাহাজ ‘রিচ স্টারি’ পুনরায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে শিপিং সূত্রে জানা গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মঙ্গলবার পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও বুধবার জাহাজটি আবার হরমুজ প্রণালিতে ফিরে আসে। এর আগে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন এই নৌ-অবরোধ কার্যকর করে। যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, অবরোধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো বাণিজ্যিক জাহাজই মার্কিন নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করতে পারেনি এবং কয়েকটি জাহাজকে বাধ্য হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, চীনা মালিকানাধীন ‘রিচ স্টারি’ জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মিথানল বহন করে রওনা হয়েছিল এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় এটি বাধার মুখে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে চলমান এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, নৌ-বাণিজ্য ও বিমা খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং বৈশ্বিক বাজারে এর প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও মার্চ–এপ্রিল সময়ে জ্বালানি তেল বিক্রিতে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছে মহসেন পাকনেজাদ। তিনি বলেন, সংকটকালেও রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে এবং অর্জিত আয়ের অংশ তেল খাত পুনর্গঠনে ব্যয় করা উচিত। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) আল জাজিরা-এর বরাতে জানা যায়, ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি অপরিশোধিত তেলের বাজারমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরও উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রুট হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে একটি চীনা ট্যাংকার অবরোধ উপেক্ষা করে গন্তব্যে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রিচ স্টারি’ নামের ওই জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়া বন্দর থেকে প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল মিথানল বহন করে যাত্রা করে এবং উপসাগরীয় জলসীমা অতিক্রম করে বেরিয়ে যায়। জাহাজটির মালিকানা রয়েছে সাংহাইভিত্তিক একটি শিপিং কোম্পানির অধীনে। ঘটনাটি চলমান অবরোধ পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নৌনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।