বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট প্রেক্ষাপটে এই নীতিমালা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মুদ্রানীতিতে রেপো রেট আগের মতো ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হারও মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এতে ঋণের খরচ আগের মতোই থাকবে, যার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর কিছুটা চাপ অব্যাহত থাকবে।
এই নীতিমালায় মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা শিথিল করে ৭ থেকে ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। যদিও আগের মুদ্রানীতিতে তা ৬ দশমিক ৫ শতাংশের আশপাশে রাখা হয়েছিল। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও বৈশ্বিক বাজারে খাদ্য, জ্বালানি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি তা কঠিন করে তুলছে। ফলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাস্তবভিত্তিক বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
নতুন নীতিমালায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগে কিছুটা মন্থরতা থাকতে পারে, যদিও সরকারের বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে ব্যাংক খাতের সম্পৃক্ততা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিদেশি মুদ্রার বাজারে চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যবস্থাপনা নির্ভর ভাসমান বিনিময় হার’ (managed floating exchange rate) নীতিতে অটল থাকবে বলে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করবে এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে উৎসাহ দেবে। রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা অব্যাহত রাখা, এবং রেমিট্যান্স উৎসাহে প্রবাসীদের ব্যাংক চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনবিএফআই তথা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা সম্প্রসারণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনো নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই মুদ্রানীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হলেও স্বল্পমেয়াদে কিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। উচ্চ সুদের পরিবেশে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমে যেতে পারে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষায় স্বচ্ছতা, স্থিতিশীল নীতিমালা ও নিয়মিত তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত জরুরি।
এই মুহূর্তে বাজারে প্রতিটি সিদ্ধান্তকেই গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। মুদ্রানীতির বাস্তব প্রয়োগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় তদারকি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক গতি-প্রবাহ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারি প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়ে রাত ৮টার পর ঢাকার সকল দোকান ও শপিংমল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হোটেল, ফার্মেসি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের দোকান এবং কাঁচাবাজার এই নির্দেশের বাইরে থাকবে। সমিতির স্ট্যান্ডিং কমিটির যৌথ সভায় আলোচিত এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হলো দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়কে সর্বাধিক কার্যকর করা।
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) শনিবার (২৮ মার্চ) ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৭ টাকা বৃদ্ধি করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ১২ টাকায়। নতুন দর আজ সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে। বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন সমন্বয় অনুযায়ী ২১ ক্যারেটের দাম ২ লাখ ২৬ হাজার ২৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯১৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির দাম ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩১ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এর আগে শুক্রবার (২৭ মার্চ) টানা সপ্তম দফা কমানোর পর ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে স্বর্ণের দাম ইতিমধ্যেই ৪৮ বার সমন্বয় করা হয়েছে; এর মধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে ২৭ বার, কমানো হয়েছে ২১ বার। ২০২৫ সালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ৯৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রায়ত্ত নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া। সোমবার (১৬ মার্চ) তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করেছেন। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সরকার তাকে ব্যাংকটির প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ব্যাংকটির কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই তার এই পদত্যাগ ব্যাংকিং খাতে নতুন আলোচনা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তীব্র তারল্য সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক— এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে এবং অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারের মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, ব্যাংকটির শীর্ষ নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা এর আগেও দেখা দেয়। সরকারের নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মনোনীত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ওই পদে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক—দুই গুরুত্বপূর্ণ পদই শূন্য থাকায় দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের আস্থা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ও দক্ষ নেতৃত্ব অপরিহার্য।