ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সংসদে আসন পেতে সক্ষম হয়েছেন মাত্র ৯টি দল। এদের মধ্যে চারটি ইসলামি দল মোট ৭২টি আসনে জয়ী হয়ে রাজনৈতিক ইতিহাস রচনা করেছে—১৯৭৩ সালের পর প্রথমবার একাধিক ধর্মভিত্তিক দল সংসদে প্রবেশ করলো।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে তারেক রহমান সরকার গঠনের জন্য বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। তবে জামায়াতে ইসলামী ও তার নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক তিনটি ছোট ইসলামি দলও সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ‘রিকশা’ প্রতীকে দুটি আসনে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিস ‘দেয়ালঘড়ি’ প্রতীকে একটি করে আসনে জয় পেয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি ২৯৭ আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয়ী, জামায়াতে ইসলামি ৬৮ আসন পায়, আর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬ আসনে জয়লাভ করে। ইসলামি দলের বিজয় মধ্যম ও ছোট জেলা থেকে এসেছে, যেখানে নির্বাচিত প্রার্থীরা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও জোটের সমর্থন রেখেছেন।
উল্লেখযোগ্য বিজয়গুলো:
বাকি ইসলামি দলের প্রার্থীরা বেশ কয়েকটি আসনে শক্ত অবস্থান সত্ত্বেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে ছিলেন। এই ফলাফলে স্পষ্ট যে, ইসলামি দলগুলো ২০২৪ সালের নির্বাচনে পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন দিক নির্দেশ করবে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর শীর্ষ নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর বাড্ডায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-এর বাসভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বাসায় প্রবেশের সময় তারেক রহমান নাহিদ ইসলাম ও উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে বুকে টেনে নেন তারেক রহমান। বিএনপি সূত্র জানায়, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক সংলাপের উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুর নবী খান সোহেল, হুমায়ুন কবির এবং চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে এনসিপির পক্ষে সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সারজিস আলমসহ দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া) আসনে ইতিহাস গড়লেন ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি দেশের সর্বকনিষ্ঠ নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে এ আসনে প্রথম নারী এমপি হিসেবেও নিজের নাম লেখালেন তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপির হারানো ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিলেন পুতুল। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আসমা শাহীন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন পুতুল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা) পান ৮৯ হাজার ৪৩১ ভোট। বিজয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় পুতুল মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “এই বিজয় লালপুর–বাগাতিপাড়ার আপামর মানুষের। দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের অক্লান্ত পরিশ্রমই এ সাফল্যের মূল ভিত্তি।” রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেওয়া পুতুল বিএনপি সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, মরহুম ফজলুর রহমান পটল–এর কন্যা। ফজলুর রহমান পটল ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এ আসন থেকে ধারাবাহিকভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নাটোর-১ আসনকে বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছিলেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি হাতছাড়া হয় এবং পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় বিএনপি সেখানে প্রতিনিধিত্বহীন থাকে। বাবার মৃত্যুর পর সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত করলেন পুতুল। তার এ বিজয় কেবল একটি আসন পুনরুদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং প্রজন্মান্তরের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ–বকশিগঞ্জ) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এর আগে তিনি ২০০১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেওয়ানগঞ্জ ও বকশিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ১২৯টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে দেওয়ানগঞ্জে ৭৬টি এবং বকশিগঞ্জে ৫৩টি কেন্দ্র। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫৬ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ নাজমুল হক সাঈদী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৯৭ হাজার ৮২০ ভোট। ফলে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ৭৫ হাজার ৮৩৬। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত মো. আব্দুর রউফ তালুকদার হাতপাখা প্রতীকে ৪ হাজার ১২১ ভোট, **জাতীয় পার্টি**র এ. কে. এম ফজলুল হক লাঙল প্রতীকে ৯৩১ ভোট এবং **গণধিকার পরিষদ**র মো. রফিকুল ইসলাম ট্রাক প্রতীকে ২২৬ ভোট পেয়েছেন। ফলাফল ঘোষণার পর এলাকায় বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।