মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে মোট ৫৪টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, হামলায় খোররামশাহর সুপার-হেভি ক্ষেপণাস্ত্র, খায়বার-শাখান, কদর ও এমাদ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো কৌশলগত জ্বালানি চালিত সেজিল ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়, সেজিল একটি মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-সারফেস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা থেকে ইসরায়েলের তেল আবিব পর্যন্ত দূরত্ব অল্প সময়ের মধ্যেই অতিক্রম করতে সক্ষম।
এদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনা তারা শনাক্ত করেছে। আগের হামলার খবর প্রকাশের দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এই নতুন আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে বলে তাদের দাবি।
উল্লেখ্য, গত ১৭ দিন ধরে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে ইরানে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে দুই হাজার ছাড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ।
ইরান ইস্যুতে উত্তেজনার মধ্যেই সীমিত পরিসরের শক্তিশালী সামরিক বিকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের এক প্রতিবেদনে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি কিন্তু লক্ষ্যভিত্তিক হামলার’ একটি পরিকল্পনা পেন্টাগন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এই পরিকল্পনার নকশা তৈরি করেন। এতে ইরানের তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া নেটওয়ার্ককে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাতে দ্রুত কৌশলগত ক্ষতি সাধন করা যায়। তবে এখনো পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ প্রস্তাবে অনুমোদন দেননি। তিনি বরং ইরানের ওপর নৌ-চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ অব্যাহত রাখার কৌশলকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। অন্য একটি বিকল্প পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালির কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ও উঠে এসেছে, যা বাস্তবায়নে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা রয়েছে। এক্সিওস ও বিবিসির তথ্যমতে, ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া আংশিক শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পরই এই সামরিক বিকল্পগুলো সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আনা হয়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ডার্ক ঈগল’ মোতায়েনের প্রস্তাবও দিয়েছে সেন্টকম, যা অত্যন্ত শক্তিশালী ও গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। প্রতিবেদনে বলা হয়, কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হলে দ্রুত সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প এখনো উন্মুক্ত রেখেছে ওয়াশিংটন।
হরমুজ প্রণালি ও ইরানের উপকূলীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অবরোধ অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা’ অভিযান চালিয়ে ‘এম/টি স্ট্রিম’ নামের ট্যাংকারটি থামিয়ে দেয়। সেন্টকমের দাবি, জাহাজটি অবরোধ অমান্য করে ইরানের একটি বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ট্যাংকারটি সর্বশেষ মালাক্কা প্রণালিতে দেখা যায়। ঘটনাটিকে এর আগে ‘জলদস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতি’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইরান। তবে এ বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন, দুই পরাশক্তির মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বেইজিং। সোমবার (২৭ এপ্রিল) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতি চীন কখনোই মেনে নেয় না এবং নিজেদের কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ পদক্ষেপে ইরান-সম্পর্কিত অভিযোগে চীনের একাধিক শোধনাগারসহ প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়, যাকে ‘অবৈধ তেল বাণিজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটন। এর জবাবে বেইজিং এসব পদক্ষেপকে ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’ ও ক্ষমতার অপব্যবহার বলে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে, একইসঙ্গে সম্ভাব্য পাল্টা অর্থনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-কেন্দ্রিক জ্বালানি বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে।