যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ব্যর্থতার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা শঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছে। কূটনৈতিক সমঝোতার পথ ভেস্তে যাওয়ার পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়ছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেন, দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই বিপরীতমুখী যে আপাতত কোনো সমঝোতা সম্ভব হয়নি। কোনো চুক্তি ছাড়াই উভয় পক্ষের প্রতিনিধি দল দেশ ত্যাগ করে।
এর মধ্যেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-নিয়ন্ত্রণ বা অবরোধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজধানীতে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আবুধাবি, তেহরান ও তেল আবিবসহ বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ মনে করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ভাঙন শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকেই নতুন সংকটের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে কিছু তেল স্থাপনা পুনরুদ্ধারের খবর এলেও সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এবং পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক হিসেবে বর্ণনা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সংলাপ ভেঙে পড়ায় এখন মধ্যপ্রাচ্য কার্যত উচ্চঝুঁকির এক অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে যেকোনো ছোট ঘটনা বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নৌ-অবরোধের হুমকিকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি এ পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। রোববার (১২ এপ্রিল) তেহরানে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সামরিক তৎপরতা ইরানের নৌবাহিনীর নিবিড় নজরদারিতে রয়েছে। তিনি ট্রাম্পের হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পরাজয় ঢাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, অতীতের সংঘাতে ব্যর্থতার পর এ ধরনের ঘোষণা কেবল দুর্বলতাই প্রকাশ করে। ইরানি নৌপ্রধান দাবি করেন, তাদের বাহিনী আঞ্চলিক জলসীমায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি শক্তির চাপ বা অবরোধ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও ব্যর্থ আলোচনার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে রাশিয়া প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রোববার (১২ এপ্রিল) ক্রেমলিনের বরাতে জানানো হয়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এক আলাপে পুতিন এ অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমন এবং রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে মস্কোর সক্রিয় সহায়তার আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন। ক্রেমলিনের বিবৃতিতে বলা হয়, রাশিয়া সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে এবং দীর্ঘমেয়াদি ও ন্যায্য শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়ক ভূমিকা পালনে প্রস্তুত। মস্কো এ উদ্যোগকে চলমান আঞ্চলিক সংকট নিরসনে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথ হিসেবে দেখছে বলে জানানো হয়েছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ সক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক আলোচনা প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইসলামাবাদে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ফলাফল নিয়ে মন্তব্য করে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, দীর্ঘ যুদ্ধ-পরবর্তী অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক সন্দেহের পরিবেশে এক বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো “বাস্তবসম্মত ছিল না”। তিনি জানান, দুই পক্ষই চরম আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে সংলাপে অংশ নেয়, ফলে শুরু থেকেই তাৎক্ষণিক চুক্তির প্রত্যাশা অতিরঞ্জিত ছিল। তবে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এখন অগ্রাধিকারের বিষয়। ইসহাক দার আরও বলেন, জটিল এই ভূরাজনৈতিক সংকট সমাধানে ধাপে ধাপে আস্থা গড়ে তোলাই একমাত্র কার্যকর পথ, যেখানে সব পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আলোচনার ফলাফল নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও তেহরানের “বৈধ অধিকার” স্বীকৃতির ওপর। অন্যদিকে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে, মার্কিন “কঠোর শর্ত” ও অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে ২১ ঘণ্টার টানা আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা অব্যাহত রাখবে এবং ভবিষ্যৎ সংলাপের পথ খোলা রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।