যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ৫৬তম বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ফাঁকে নতুন গঠিত ‘শান্তি পর্ষদ’-এর আনুষ্ঠানিক সনদে স্বাক্ষর করেছেন। এই অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে বাহরাইন ও মরক্কোর শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
ট্রাম্প স্বাক্ষরের সময় বলেন,
“এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, এবং আমি এখানে এসে এটি বাস্তবায়ন করতে পেরে আনন্দিত।”

সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে শান্তি পর্ষদকে আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটও নিশ্চিত করেছেন, এখন এটি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে কার্যকর।
শান্তি পর্ষদ মূলত গাজা পুনর্গঠনকে লক্ষ্য করে গঠিত হলেও ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত নিরসনে কাজ করবে। এতে যোগ দিতে প্রতিটি দেশকে ১০০ কোটি ডলার অবদান রাখতে হবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, তুরস্ক, বেলারুশ, ইসরায়েল ও পাকিস্তানসহ প্রাথমিকভাবে ৩৫টি দেশ যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে জাতিসংঘের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের মধ্যে কেউ এখনও এতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হননি। ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য সরাসরি যোগ দেবে না বলে জানিয়েছে, রাশিয়া প্রস্তাব যাচাই করছে এবং চীন এখনও মন্তব্য করেনি।
ট্রাম্পের মতে, শান্তি পর্ষদকে তিনি ‘অকেজো’ জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে দেখছেন। এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক স্তরে সংঘাত নিরসনের নতুন কাঠামো এবং মানবিক পুনর্গঠন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার সময় ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গুরুতর আঘাতগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। ৫৬ বছর বয়সী খামেনি সম্প্রতি তার পিতা আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। প্রতিবেদনে ইরানি ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হামলার প্রথম দিনেই তার পায়ে আঘাত লেগেছে। বর্তমানে মোজতবা খামেনি কোথায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বা শারীরিক অবস্থার প্রকৃত তথ্য কী, তা প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি জনসমক্ষে বা টেলিভিশনে ভাষণ দিতে অনুপস্থিত থাকায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন সীমিত হতে পারে। এ ঘটনায় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামরিক মনোবলে প্রভাব পড়তে পারে। তেহরানের রাস্তায় তার ছবি ও ব্যানার থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখছে বলে জানা গেছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরে ভিন্নমত ও কৌশলগত আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা তাকে সংঘাত থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার একটি কৌশল নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং এর রাজনৈতিক প্রভাবও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নেতিবাচক হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই উপদেষ্টারা সংঘাত সীমিত রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোর অনেকটাই ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। তবে প্রশাসনের ভেতরে ভিন্ন অবস্থানও রয়েছে। একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রাখে এবং ইসরায়েল যদি প্রতিরোধমূলক অভিযান চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্রুত যুদ্ধ থেকে সরে আসা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পূর্ণাঙ্গ সামরিক সাফল্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে আগ্রহী নন বলে প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দেওয়া শর্ত মেনে নিতে ইরানের অনীহা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইচ্ছা থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান এখনো স্পষ্ট নয় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সর্বশেষ অভিযানে হাইপারসনিকসহ মোট চার ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল ও অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি আইআরজিসির বরাতে জানায়, এ হামলাটি ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) পরিচালিত ৩৪তম দফার ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান। এতে তিন ধরনের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির কাছে অবস্থিত আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জুফায়ার এলাকায় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। এছাড়া ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি ও হাইফার বেসামরিক বিমানবন্দরেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি গোপন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনাতেও আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। তবে এসব হামলার ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন সূত্র থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।