মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সংঘাত ধনকুবেরদের যাতায়াতের রীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, ফলে শহরে বসবাসকারী ধনকুবেররা প্রাইভেট জেট ছাড়া নিরাপদ প্রস্থান করতে পারছেন না। পার্শ্ববর্তী ওমানের মাস্কাট বিমানবন্দর চালু থাকলেও যাত্রী চাপ বেড়ে ভ্রমণ বিলম্ব হচ্ছে।
ব্যক্তিগত জেটের ভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাস্কাটভিত্তিক জেট ব্রোকারেজ সংস্থা ‘জেটভিআইপি’ জানিয়েছে, ছোট জেটের মাধ্যমে ইস্তানবুল যাওয়ার খরচ প্রায় ৮৫,০০০ ইউরো। সৌদি আরব থেকে ইউরোপ পর্যন্ত প্রাইভেট জেট ভাড়া ৩৫০,০০০ ডলারে পৌঁছাচ্ছে। অনেক বেসরকারি অপারেটর নিরাপত্তা ও বিমা জটিলতার কারণে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রেখেছে।
এই পরিস্থিতিতে ধনকুবেররা সৌদি আরব বা অন্য নিরাপদ পার্শ্ববর্তী দেশে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপ বা অন্যান্য গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং চলমান উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্য এখনো ব্যক্তিগত বিমানের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জায়নবাদী মতাদর্শকে মুসলিম বিশ্বে অস্থিতিশীলতার উৎস এবং “মানবতার জন্য হুমকি” হিসেবে অভিহিত করেছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত “চাপিয়ে দেওয়া” হয়েছে এবং এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি পাকিস্তানের নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে। তিনি বলেন, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইসলামি বিশ্বের ওপর সংঘটিত বিভিন্ন সংঘাতের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জায়নবাদী রাষ্ট্রনীতির ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে বহিরাগত হুমকির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে প্রতিরোধক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, করাচি, স্কার্দু ও ইসলামাবাদে সংঘর্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপের ঘটনায় একাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেট সংলগ্ন বিক্ষোভ চলাকালে গুলিবর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় কার গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশিত হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ভোরে উত্তর ইসরায়েলের রামাত দাভিদ বিমানঘাঁটিতে একাধিক ড্রোন ব্যবহার করে রাডার ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। সংগঠনটি এই হামলাকে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনার জবাব হিসেবে উপস্থাপন করেছে। একই সময়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বাহরাইনের শেখ ইসা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটিতে ‘বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা’ চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, হামলায় ২০টি ড্রোন ও তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যার ফলে প্রধান কমান্ড ভবন এবং জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লেগেছে। বাহরাইন সরকারের পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়ে এখনও কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের উপর চালানো সাম্প্রতিক হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সোমবার জেরুজালেমের পশ্চিমে বেইম শেমেস শহরে ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন করেছেন। এই সময় তিনি বলেন, ‘অপারেশন রোরিং লায়নের তৃতীয় দিন শুরু হয়েছে, যা ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে পরিচালনা করছে। এর লক্ষ্য ইসরায়েল ও বিশ্বের নিরাপত্তার ওপর হুমকি প্রতিহত করা।’ নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘ইরানের স্বৈরশাসকরা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন। আমরা তাদের প্রতিহত করি যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ থাকে।’ তিনি ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে উল্লেখ করেন, ‘তারা শুধু ইসরায়েল বা আমেরিকাকেই নয়, ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।’