মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান–ইসরাইল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটনে নীতিগত ভিন্নমতের ইঙ্গিত মিলেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বক্তব্যে ইসরাইলের সূচিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত সম্পৃক্ত রয়েছে বলে মন্তব্য করলেও, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথকভাবে এর দায়ভার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নেন এবং মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি একমত হননি।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) হোয়াইট হাউসে জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানের সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে আগাম সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ইরানের বিমান, নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক হাজার সাতশোর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, বর্তমান পর্যায়ে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ “অতিক্রান্ত” হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর ইরান আলোচনার আগ্রহ দেখালেও তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে।
অন্যদিকে, আঞ্চলিক গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে এবং প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তার পুত্র মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক নিশ্চিতকরণ এখনো মেলেনি।
উল্লেখ্য, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু করে। তেহরানে হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায় এবং পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত আঞ্চলিক বিস্তারের ঝুঁকিতে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললেও এখন পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইরানের কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংসের দাবি জানালেও, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডিফ্রিন এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, “আমরা ফ্রন্টলাইনে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে কাজ করা কয়েক ডজন লঞ্চার ধ্বংস করেছি। হামলা অব্যাহত থাকবে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কমানোর চেষ্টা করা হবে। তবে ইরানের উল্লেখযোগ্য নিক্ষেপ ক্ষমতা এখনও অক্ষত।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এত শক্তিশালী যে তা অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। এছাড়া অভিযানে ২০০টি যুদ্ধবিমান, দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং কয়েকটি বোমারু বিমান অংশগ্রহণ করছে। কুপারের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি। তিনি বলেন, লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে যেসব থেকে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের নৌবাহিনীর কার্যক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে এবং তাদের প্রধান সাবমেরিন ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত ১৭টি ইরানি জাহাজ ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে। সমুদ্র, আকাশ ও সাইবার স্পেস—তিনটি ক্ষেত্রেই অব্যাহত অভিযান চলছে। সেন্টকম প্রধানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষা করা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস প্রাঙ্গণে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স বুধবার (৪ মার্চ) একটি অবগত সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনটি সম্ভাব্যভাবে ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত নয় যে দূতাবাস চত্বরে অবস্থিত সিআইএ-এর স্টেশনটি সরাসরি লক্ষ্যবস্তু ছিল কিনা। এ বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।