ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা যদি আরও দশ দিন স্থায়ী হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও সমরাস্ত্র মজুত বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে পেন্টাগন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের চতুর্থ দিনে সেন্ট কম্যান্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে অবহিত করেছেন।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত শুধু অস্ত্রের মজুত কমাবে না, বরং ফুরিয়ে যাওয়া গোলাবারুদ পুনরায় সংগ্রহ করতে মার্কিন বাজেটে বিশাল বোঝা তৈরি হবে। যদিও ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার ইতিহাসের সর্বোত্তম অবস্থায় আছে এবং ‘চিরকাল’ যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে। জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন উল্লেখ করেছেন, ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তার ফলে আমেরিকার নিজস্ব মজুত ইতিমধ্যেই সংকুচিত। গত বছরের ইরান সংঘাতের সময় থাড ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যবহার হয়ে গেছে।
এছাড়া, ইরান মাসে প্রায় ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ৬–৭টি ইন্টারসেপ্টর মাসে উৎপাদন করতে সক্ষম। আর্থিক দিক থেকেও উদ্বেগ বাড়ছে; একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়। যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় খরচ হয়েছে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ২১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, জেডিএএম বোমা বা নৌ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টরও এখন সীমিত। মূল কারণ হিসেবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও ইরানের বিরুদ্ধে বারবার সামরিক অভিযান চালানোকে দায়ী করা হচ্ছে। পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত সংক্ষিপ্ত ও তীব্র সংঘাত মোকাবিলার জন্য তৈরি হলেও, ইরানের মতো দীর্ঘমেয়াদী এবং কম ব্যয়বহুল হামলা সামলানোতে তা অর্থনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান, যা নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ‘চূড়ান্তভাবে পরাজিত’ করতে নৌবাহিনীসহ সব সামরিক সক্ষমতা প্রস্তুত রয়েছে। একই সময় কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালি-কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজে গোলাগুলির অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার কোনো ভিত্তি নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পারস্পরিক হুঁশিয়ারি ও সামরিক উত্তেজনা অঞ্চলটিকে নতুন করে অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে কৌশলগত জলপথে নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে ইরান, যার ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, প্রণালির ওপর পুনরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং এটি এখন সশস্ত্র বাহিনীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে ‘সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানি জাহাজ চলাচলে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিতে চলাচল পূর্বের মতো উন্মুক্ত থাকবে না। এদিকে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও সতর্ক করে জানিয়েছেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ইরানের অনুমোদন সাপেক্ষে সীমিত থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথে নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ইঙ্গিত দিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাভিত্তিক নতুন ফি আরোপের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি স্পষ্ট করেছেন—প্রচলিত ট্রানজিট ফি আরোপ না করলেও প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক আর্থিক কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি খসড়া আইন সংসদে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায়, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজসমূহকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পূর্ব সমন্বয় বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সংযুক্ত সামরিক জাহাজের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের কথাও ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নীতির সঙ্গে সম্ভাব্য সাংঘর্ষিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে। অন্যদিকে, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, প্রণালির নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বহিরাগত শক্তি—বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ রাষ্ট্রের জাহাজগুলো নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে চলাচলের অনুমতি পেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে সীমিত সময়ের জন্য প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয় তেহরান। এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তবে নতুন ফি আরোপের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্র আইনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।