পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো স্থল অভিযান বা ইরানি ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়, তার ফল হবে ভয়াবহ এবং মার্কিন সেনারা ‘হাঙ্গরের খোরাক’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
রোববার (২৯ মার্চ) ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি এ কথা জানান।
তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসনের হুমকিকে “অবাস্তব” ও “উদ্ভট” আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেন, বাহ্যিক চাপের কারণে এমন অসংলগ্ন সিদ্ধান্তে মার্কিন বাহিনী নিজেই ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে।
জোলফাকারি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যেই প্রতিদিন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন, এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘাঁটিগুলো ছেড়ে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর বেসামরিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে; কিন্তু সেখানেও তারা হামলার হাত থেকে নিরাপদ নয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো স্থল আগ্রাসনের ক্ষেত্রে দখলদার বাহিনীকে বন্দি বা নিশ্চিহ্ন করতে দ্বিধা করবে না।
মুখপাত্রের বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্ত ও সামরিক কৌশল পুরো বাহিনীকে বিপদে ফেলছে। তিনি মার্কিন সেনাদের প্রতি আহ্বান জানান, ইরানের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন এবং অতীতে বিদেশি আগ্রাসীদের পরিণতি স্মরণ করুন।
এর আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়। জবাবে ইরানি বাহিনী আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা সংঘাতকে চরম উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে।
সংক্ষেপে, ইরান মার্কিন স্থল আগ্রাসনের সম্ভাব্য যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং প্রতিটি হামলার জবাবে চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) রোববার (২৯ মার্চ) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরি গত বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি বিবৃতিতে তাকে “নিবেদিতপ্রাণ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব” হিসেবে বর্ণনা করেছে, যিনি দীর্ঘদিন ইরানের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও রণকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তাংসিরির ওপর ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তিনি আইআরজিসি নৌবাহিনীর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার তদারকি এবং সশস্ত্র ড্রোন উৎপাদন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব বিস্তৃত ছিল, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাংসিরির অনুপস্থিতি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে, তার মৃত্যু বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ণ করতে পারবে না এবং প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। ইসরায়েলের লক্ষ্যভেদী এই হামলা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি জোটের চলমান উত্তেজনাকে তীব্রতর করেছে। ইরান এখন শোক প্রকাশের পাশাপাশি উচ্চপদস্থ এই কমান্ডারের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নতুন সতর্কবার্তা দিয়ে কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ কৌশলবিদ ম্যাডিসন কার্টরাইট জানিয়েছেন, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত স্বল্পমেয়াদে প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং তা অন্তত আগামী জুন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই সংঘাত থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না, কারণ এ যুদ্ধের সঙ্গে একাধিক আঞ্চলিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ জড়িত। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী বাণিজ্য নীতিতে প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বহুপক্ষীয় ও জটিল। অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে দেশটির ন্যাশনাল ক্যাবিনেট ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল প্রণয়নে কাজ করছে। সীমিত জ্বালানি মজুত বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন কার্টরাইট। ইতোমধ্যে সিডনিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রভাবের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী সমাধানের জন্য সম্ভাব্য যে কোনো চুক্তিতে ইরান ও ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য; অন্যথায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার সংঘাত নিরসনে কার্যকর হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য বিরাজ করছে, যা কূটনৈতিক সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ ও মূল্যে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। সার্বিক প্রেক্ষাপটে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার (২৭ মার্চ) জানিয়েছেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষ মাস বা বছরের নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হতে পারে। তিনি বলেন, স্থলবাহিনী মোতায়েন ছাড়াই ওয়াশিংটন তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম। ফ্রান্সে জি৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক শেষে রুবিও সাংবাদিকদের জানান, অভিযানের অগ্রগতি নির্ধারিত সময়সূচির চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান ‘অতীতের তুলনায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়’ থাকবে। মার্কিন মিডিয়া এক্সিওসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধে প্রবেশের পর এটি আরও দুই থেকে চার সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। রুবিও বলেন, যুদ্ধ শেষের পর প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে হরমুজ প্রণালীতে ইরান যেন জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। এই নৌপথে বিশ্বব্যাপী তেলের প্রায় ২০% পরিবাহিত হয়। তিনি আরও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরানের সঙ্গে বার্তা বিনিময় করেছে, এবং কিছু বিষয়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যদিও তেহরান এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।