আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমনে কূটনৈতিক অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে আপাত শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর ইরানও তাদের সামরিক অবস্থানে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক হামলা বন্ধ থাকলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিরোধমূলক অভিযান স্থগিত রাখবে।
এদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে তেহরান। আগামী দুই সপ্তাহ প্রণালিটি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচল সম্ভব হবে বলে জানানো হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা মেনে চলার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, যা ইসরায়েলও মেনে চলার ঘোষণা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বুধবার (৭ এপ্রিল) ঘোষণা করেছেন, তার দেশের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব প্রান্তে অবিলম্বে কার্যকর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। ইসলামাবাদে আগামী শুক্রবার দু’দেশের প্রতিনিধিদলকে বৈঠকের জন্য স্বাগত জানানো হবে, যেখানে চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। শাহবাজ আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর হবে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছে, তার দেশ এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত নয় এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে। নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরানকে এমন অবস্থানে নিয়ে আসা যাতে তারা পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সন্ত্রাসী হুমকি তৈরি করতে না পারে। যদিও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যকে সমর্থন জানাচ্ছে, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে লেবাননের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনও ছাড় নেই। এই অবস্থার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কঠিন হয়ে উঠেছে, যেখানে ইসলামাবাদে আসন্ন আলোচনাই সম্ভাব্য সমাধানের মূল কেন্দ্রে রয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঘোষিত ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের কৌশলগত অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করেছে হোয়াইট হাউজ। বুধবার (৮ এপ্রিল) একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে, যা পরবর্তীতে কূটনৈতিক আলোচনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সামরিক অগ্রগতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে শক্তিশালী দরকষাকষির সুযোগ তৈরি করে এবং তা সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ সুগম করেছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্প প্রশাসনের সক্ষমতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে হলে ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ‘সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে’ নিশ্চিত করতে হবে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা গড়ে ওঠে। তাঁর দপ্তর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট শর্ত মেনে ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে সম্মত হওয়ায় যুদ্ধবিরতি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার পথে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চাপ, কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য ট্রাম্পকে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হলে ক্ষমতা ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে চলে যায়। অ্যারিজোনার কংগ্রেসওম্যান ইয়াসামিন আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, “ট্রাম্প অবৈধ যুদ্ধ উসকানি দিচ্ছেন এবং ইরানের বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করছেন, যা গত ৪৮ ঘণ্টায় সীমা অতিক্রম করেছে।” মিনেসোটার কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমর বলেন, “এই অস্থির মানসিকতার ব্যক্তিকে অবিলম্বে ক্ষমতা থেকে সরানো প্রয়োজন।” নিউ মেক্সিকোর কংগ্রেসওম্যান মেলানি স্ট্যান্সবুরি যোগ করেন, “২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের সময় এসেছে, কংগ্রেস ও মন্ত্রিসভা এখনই পদক্ষেপ নিক।” ইলিনয়ের সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান জো ওয়ালশ মন্তব্য করেন, “ট্রাম্প চিরস্থায়ীভাবে দেশ ও বিশ্বের জন্য কলঙ্ক। এখনই সংশোধনী প্রয়োগ করা উচিত।” ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফিও বলেন, “মন্ত্রিসভা এখনই সাংবিধানিক আইনজীবীদের সঙ্গে ২৫তম সংশোধনী নিয়ে আলোচনা করা উচিত।” সবমিলিয়ে, ইরান-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে এই দাবিগুলো রাজনৈতিক উত্তেজনার তীব্রতা আরও বাড়িয়েছে।