দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার তিনটি আসনেই বিএনপির ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের আধিপত্যের অবসান হয়েছে। এতে জেলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হলেও এখন আলোচনার কেন্দ্রে—নতুন মন্ত্রিসভায় মানিকগঞ্জ থেকে কেউ স্থান পাবেন কি না।
২০০৮ সালের আগে মানিকগঞ্জে চারটি সংসদীয় আসন থাকলেও সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর তা কমে তিনটি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে জেলার সব আসন আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। ওই সময়ে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ মালেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও পরে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা জেলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ায়।
এর আগে বিএনপি সরকারের সময় মানিকগঞ্জ থেকে একাধিক মন্ত্রী ছিলেন। ফলে জেলাটি দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব পেয়ে আসছে—যা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করেছে।
২০০৮ সালের পর মানিকগঞ্জে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও নেতৃত্বে আসেন প্রয়াত হারুনার রশিদ খান মুন্নুর কন্যা আফরোজা খানম রিতা। তিনি জেলা বিএনপির দায়িত্ব পালন করেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি নানামুখী চাপের মুখেও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি মানিকগঞ্জের তিনটি আসনেই জয়ী হয়। এর মাধ্যমে দলটি জেলার ঐতিহ্যগত ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানিকগঞ্জে দীর্ঘদিন মন্ত্রী থাকার একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। বিএনপির একাংশ মনে করে, আফরোজা খানম রিতাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা হবে ত্যাগের স্বীকৃতি। তবে মন্ত্রিসভা গঠনে আঞ্চলিক ভারসাম্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
মানিকগঞ্জে বিএনপির নতুন যাত্রা শুরু হলেও এই অর্জন ধরে রাখা এবং উন্নয়ন প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব সেই প্রক্রিয়ায় কতটা ভূমিকা রাখবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সংসদীয় আইনানুগ বাধ্যবাধকতার প্রেক্ষিতে একটি আসন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে অনুযায়ী তিনি বগুড়া–৬ আসনটি পরিত্যাগ করে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছেন। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) কমিশনে পৌঁছানো চিঠিতে তিনি ঢাকা–১৭ আসনটি সংরক্ষণের কথা জানান। কমিশন সূত্র জানায়, আইন অনুযায়ী একাধিক আসনে নির্বাচিত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে কেবল একটি আসন গ্রহণ করা যায়; অবশিষ্ট আসন শূন্য ঘোষণা করে সেখানে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হবে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর শীর্ষ নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর বাড্ডায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-এর বাসভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বাসায় প্রবেশের সময় তারেক রহমান নাহিদ ইসলাম ও উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে বুকে টেনে নেন তারেক রহমান। বিএনপি সূত্র জানায়, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক সংলাপের উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুর নবী খান সোহেল, হুমায়ুন কবির এবং চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে এনসিপির পক্ষে সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সারজিস আলমসহ দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া) আসনে ইতিহাস গড়লেন ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি দেশের সর্বকনিষ্ঠ নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে এ আসনে প্রথম নারী এমপি হিসেবেও নিজের নাম লেখালেন তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপির হারানো ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিলেন পুতুল। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আসমা শাহীন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন পুতুল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা) পান ৮৯ হাজার ৪৩১ ভোট। বিজয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় পুতুল মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “এই বিজয় লালপুর–বাগাতিপাড়ার আপামর মানুষের। দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের অক্লান্ত পরিশ্রমই এ সাফল্যের মূল ভিত্তি।” রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেওয়া পুতুল বিএনপি সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, মরহুম ফজলুর রহমান পটল–এর কন্যা। ফজলুর রহমান পটল ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এ আসন থেকে ধারাবাহিকভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নাটোর-১ আসনকে বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছিলেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি হাতছাড়া হয় এবং পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় বিএনপি সেখানে প্রতিনিধিত্বহীন থাকে। বাবার মৃত্যুর পর সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত করলেন পুতুল। তার এ বিজয় কেবল একটি আসন পুনরুদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং প্রজন্মান্তরের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।