শিরোনাম

বাজারের বর্জ্যে দূষণের ঝুঁকিতে করতোয়া, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

বাজারের বর্জ্যে দূষণের ঝুঁকিতে করতোয়া, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বাজারের মুরগি, মাছ ও মাংসের দোকানের বর্জ্যসহ হোটেলের উচ্ছিষ্ট করতোয়া নদীতে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নদীর ওপর নির্মিত সেতু থেকে নিয়মিত এসব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে করতোয়া নদীতে বর্জ্য ফেলা হলেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বাজারে প্রাণীজ বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এক শ্রেণির ব্যক্তি সহজেই রাতের আঁধারে সেতু থেকে এসব বর্জ্য নদীতে ফেলে দিচ্ছেন।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে করতোয়া সেতুর ওপর থেকে মুরগির নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন বর্জ্য নদীতে ফেলার সময় আব্দুল মজিদ নামে এক ব্যক্তিকে বাধা দেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। তিনি ভ্যানে করে দেবীগঞ্জ বাজারের মুরগির মাংস বিক্রেতাদের দোকান থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য নদীতে ফেলতে যাচ্ছিলেন।

আব্দুল মজিদ জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন দোকান থেকে মুরগির চামড়া, পালক, নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন বর্জ্য সংগ্রহ করেন তিনি। এসব বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় নদীতে ফেলে দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন করতোয়া নদীতে অসংখ্য মানুষ গোসল করেন। অথচ নদীতে মুরগির নাড়িভুঁড়ি, পচা ডিমের খোসা ও হোটেলের উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। দ্রুত এসব বন্ধ করা প্রয়োজন।

দেবীগঞ্জ সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সমর রঞ্জন পাল বলেন, বাজারের মুরগি ও বয়লার ব্যবসায়ীরা সারাদিনের বর্জ্য জমিয়ে রাখেন। রাতে এক শ্রেণির ব্যক্তি প্রতিটি দোকান থেকে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে সেতুর ওপর থেকে নদীতে ফেলে দেন। বিষয়টি অনেকেই জানলেও কার্যকর প্রতিবাদ না থাকায় তা বন্ধ হচ্ছে না।

তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। দেবীগঞ্জ পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ বিন জিয়া বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে। পশু ও হাঁস-মুরগি জবাইয়ের পর বর্জ্য সংরক্ষণের জন্যও ডাস্টবিন রয়েছে। প্রতিদিন পৌরসভার গাড়িতে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হয়। সচেতনতার অভাবেই কেউ কেউ নদীতে বর্জ্য ফেলতে পারেন।

তবে সরেজমিনে দেবীগঞ্জ কাঁচাবাজার ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রাণীজ বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য বাজারে নির্দিষ্ট ডাস্টবিন নেই। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীও নেই। ফলে অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের উদ্যোগেই বর্জ্য পরিষ্কার করেন।

কাঁচাবাজারের মুরগির মাংস বিক্রেতা আরিফ ও সোহেল জানান, সারাদিনের চামড়া, পালক ও নাড়িভুঁড়ি জমিয়ে রাখার পর ভ্যানচালকের মাধ্যমে দূরে ফেলে দেওয়ার কথা। তবে ভ্যানচালক এসব বর্জ্য নদীতে ফেলে দেন, তা তারা জানতেন না বলে দাবি করেন তারা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পঞ্চগড় জেলার সাধারণ সম্পাদক আজাহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, নদী প্রকৃতি ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ফেলার ‘নিরাপদ জায়গা’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেতু থেকে সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলায় তা দ্রুত পানিতে মিশে যাচ্ছে। এতে নদীর পানি, জলজ প্রাণী ও আশপাশের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের দাবি, শুধু সচেতনতার আহ্বান জানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাজারে প্রাণীজ বর্জ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে করতোয়া নদীর পানির গুণগত মান ও জীববৈচিত্র্য ভবিষ্যতে আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর