শিরোনাম

দুই শতাব্দী ধরে পাখির কলতানে মুখর নীলফামারীর ‘পাখির গ্রাম’

দুই শতাব্দী ধরে পাখির কলতানে মুখর নীলফামারীর ‘পাখির গ্রাম’

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে হাজারো পাখির কলতানে মুখর নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটির পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়া গ্রাম। দীর্ঘদিন ধরে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই গ্রামটি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘পাখির গ্রাম’ নামে পরিচিত। পাখি ও মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানে গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ।

সবুজে ঘেরা শান্ত এই গ্রামের প্রায় ৪ একর ২০ শতক জায়গাজুড়ে রয়েছে বিশাল একটি বাঁশঝাড়। আর এই বাঁশঝাড়কে ঘিরেই গড়ে উঠেছে হাজারো পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। বাঁশঝাড়ের ডালপালায় বাসা বেঁধেছে সাদা বক, পানকৌড়ি, রাতচরা, ঘুঘু, শালিকসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির পাখি।

প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। পাখিদের ডাকেই যেন ঘুম ভাঙে ডাঙ্গাপাড়ার মানুষের। সন্ধ্যায় আবার দল বেঁধে পাখিদের ফিরে আসার দৃশ্যও মুগ্ধ করে স্থানীয়দের।

স্থানীয়রা জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা পাখিদের এই আবাসস্থল রক্ষা করে আসছেন। বিশেষ করে বাঁশঝাড়ের বর্তমান মালিক পরিবারের পূর্বপুরুষরা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে শিকারিদের হাত থেকে পাখিদের রক্ষা করেছেন। বর্তমানে পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

বাঁশঝাড়ের মালিকদের একজন মাজেদুল ইসলাম বলেন, “আমার দাদার আমল থেকেই এখানে পাখিদের বিচরণ দেখছি। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি, কেউ যেন পাখিদের কোনো ক্ষতি না করে।”

শুধু স্থানীয়রাই নন, দূর-দূরান্ত থেকেও প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী ও প্রকৃতিপ্রেমী পাখিদের অবাধ বিচরণ দেখতে ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে আসেন। স্থানীয়দের মতে, পর্যটকদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ও রেস্টুরেন্টসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে জায়গাটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা আহম্মেদ হোসেন বলেন, “প্রতিদিনই অনেক মানুষ পাখি দেখতে এখানে আসেন। পাখিদের এই দৃশ্য দেখতে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।”

তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও আশপাশের পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে পাখিদের সংখ্যা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে এলাকাটিকে পাখির নিরাপদ অভয়াশ্রম ঘোষণা করা প্রয়োজন।

ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শায়লা সাঈদ তন্বীর বলেন, “পাখির এই অভয়াশ্রমটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সেখানে একটি পুকুর খননসহ কিছু সংস্কারকাজ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে পাখির গ্রামটিকে আরও নিরাপদ ও পর্যটনবান্ধব করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এমন দীর্ঘস্থায়ী সহাবস্থানের বিরল উদাহরণ পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়া। স্থানীয়দের সচেতনতা, সরকারি উদ্যোগ ও যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দুই শতাব্দীর এই ‘পাখির গ্রাম’ ভবিষ্যতে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর