নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে শত বছরের পুরোনো লোকাচার ‘ভাদর কাটানি’। ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকে অন্তত পক্ষকাল নববধূদের বাবার বাড়িতে থাকার এই প্রথা এখনো টিকে আছে জেলার বিভিন্ন জনপদে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এ সময়ে নববধূরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় স্বামীর মুখ দর্শন করেন না।
ডোমার, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর ও নীলফামারী সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ লোকাচার চলে আসছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এর প্রচলন থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রচলিত বিশ্বাস, বিয়ের পর প্রথম ভাদ্র মাসে নববধূ ১ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত স্বামীর বাড়িতে না থেকে বাবার বাড়িতে অবস্থান করলে স্বামীর মঙ্গল হয়। এ সময় বাবার বাড়িতে চলে নানা আয়োজন। নববধূকে আনতে স্বজনেরা বরবাড়িতে যান। সঙ্গে থাকে মুড়ি, পায়েশ, মৌসুমি ফল, মিষ্টি-মণ্ডাসহ বিভিন্ন খাবার।
শুধু নববধূরাই নন, অনেক বিবাহিত নারীও কয়েকদিনের জন্য বাবার বাড়িতে নাইওর আসেন। স্থানীয়দের ভাষায় এই সময়টিই ‘ভাদর কাটানি’ নামে পরিচিত। ভাদ্র মাসে সাধারণত বিয়ের আয়োজনও কম থাকে।
ভাদর কাটানি উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলে বাবার বাড়িগুলোতে দেখা যায় উৎসবের আমেজ। মেয়েদের আপ্যায়নে থাকে নানা ধরনের খাবারের আয়োজন। নির্দিষ্ট সময় শেষে স্বামীপক্ষের লোকজনও ঘটা করে নববধূকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যান।
তবে আধুনিকতার প্রভাব এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এ প্রথার প্রচলন আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। কবে থেকে এ লোকাচারের শুরু, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য স্থানীয়দের কাছে নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতিকে তারা স্থানীয় লোকসংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবেই দেখছেন।
সৈয়দপুর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও কথাসাহিত্যিক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ভাদর কাটানি কোনো ধর্মীয় বিধান নয়; এটি এ অঞ্চলের প্রাচীন লোকাচার। একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকলেও পরে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। নববিবাহিত নারীর জীবনে সাধারণত একবারই আসা এই প্রথা এখনো এ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।