শিরোনাম
প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ১০ হাজার জোড়া, কর্মসংস্থান প্রায় ৩ হাজার মানুষের

গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি জুতা যাচ্ছে বিশ্ববাজারে

গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি জুতা যাচ্ছে বিশ্ববাজারে

এক হাত থেকে আরেক হাত। এ টেবিল থেকে ও টেবিল। কেউ জুতা সেলাই করছেন, কেউ লাগাচ্ছেন ফিতা, আবার কেউ ব্যস্ত প্যাকেজিংয়ে। একেকটি হাত যেন একেকটি মেশিন। চোখ তুলে তাকানোরও যেন ফুরসত নেই কারও। গ্রামের শত শত নারী নিজেদের শ্রম আর দক্ষতায় তৈরি করছেন উন্নতমানের জুতা। সেই জুতা পাড়ি দিচ্ছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

অজপাড়াগাঁয়ে গড়ে ওঠা একটি জুতা কারখানা বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার চিত্র। রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামে প্রায় ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত শতভাগ রপ্তানিমুখী ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড এখন হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় কেন্দ্র। কারখানাটির কর্মীদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। তাঁদের হাতের নিপুণতায় প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার জোড়া জুতা, যা রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি পরিপাটি ও কর্মচঞ্চল। জুতা তৈরির প্রথম ধাপ থেকে শুরু করে শেষ পর্যায়ের প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি কাজে রয়েছে গ্রামীণ নারীদের ব্যস্ততা। কারও হাতে জুতার সেলাই, কেউ ফিতা লাগাচ্ছেন, কেউ করছেন শেষ মুহূর্তের কারুকাজ। আবার অন্য একটি অংশে চলছে প্যাকেজিংয়ের কাজ।

জানা যায়, ২০১৭ সালের গোড়ার দিকে নীলফামারী শহরের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও আমেরিকাপ্রবাসী দুই ভাই মো. সেলিম ও মো. হাসানুজ্জামান তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামে জুতা কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। অবহেলিত এ জনপদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেই প্রায় ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়।

কারখানাটি প্রতিষ্ঠার পর বদলে যেতে শুরু করে ঘনিরামপুরসহ আশপাশের এলাকার চিত্র। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক নারী-পুরুষের জীবনে এসেছে স্বচ্ছলতা। পাশাপাশি রাস্তাঘাট, দোকানপাট, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নতুন বাসাবাড়ি গড়ে উঠছে। একসময় যে গ্রামে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার কথা মানুষ স্বপ্নেও ভাবেনি, সেখানে এখন প্রতিদিন হাজারো মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর পরিবেশ।

কারখানার কর্মী আদুরি বলেন, “এই কোম্পানি আমাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। একসময় সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। এখন নিজের আয় দিয়ে পরিবারকে সহযোগিতা করতে পারছি।”

আরেক কর্মী আবিদা বেগম বলেন, তাঁর উপার্জিত অর্থেই এখন ভালোভাবে সংসার চলছে। লাস্টিং বিভাগে কাজ করা সেলিনা বেগমের ভাষ্য, “এখানে কাজের সুযোগ পাওয়ায় আমাদের জীবন অনেকটাই বদলে গেছে।”

সাথী নামের আরেক নারী কর্মী বলেন, “এখানে কাজের পরিবেশ ও পারিশ্রমিক দুটোই সন্তোষজনক। যাদের সংসারে একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরাত, তাদের অনেকেই এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।”

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাসানুজ্জামান জানান, নীলফামারী সদর ও রংপুরের মিঠাপুকুরে প্রায় ১০ লাখ বস্তা ধারণক্ষমতার দুটি হিমাগার স্থাপনের পর তাঁরা তারাগঞ্জের ঘনিরামপুরে জুতা তৈরির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেন। তাঁর বড় ভাই মরহুম মো. সেলিমের লালিত স্বপ্নের ফসল আজকের এই জুতা কারখানা।

হাসানুজ্জামান বলেন, “অবহেলিত এ এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩ হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।”

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে এরই মধ্যে ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে দুটি ইউনিটে পুরোদমে সিনথেটিক জুতা উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার জোড়া জুতা তৈরি হচ্ছে। এসব জুতা তৈরির মূল কারিগর স্থানীয় গ্রামীণ নারীরা।

তিনি আরও জানান, উৎপাদিত জুতা পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। অচিরেই আরও একটি উৎপাদন ইউনিট চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে এমডি বলেন, শুরু থেকেই ন্যূনতম মজুরি কাঠামো অনুসরণ করে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। নারী কর্মীদের জন্য রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও চিকিৎসা সহায়তা। নতুন কর্মীদের নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং প্রশিক্ষণকালেও ভাতা দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি লাভ করেছে বলেও জানান তিনি।

ঘনিরামপুরের এই কারখানা এখন শুধু জুতা উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি পিছিয়ে পড়া জনপদের পরিবর্তনের গল্প। যে নারীরা একসময় ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, তাঁদের হাতের তৈরি জুতাই এখন পাড়ি দিচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। তাঁদের শ্রম, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার গল্প ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর