দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান গ্যাস-সংকট নিরসনে আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া সরকারের হাতে কার্যকর কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আয়োজিত ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে গ্যাস উত্তোলন বা বিদ্যমান গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। বিদেশি প্রকৌশলীরা টার্মিনাল মেরামতের কাজ করছেন। তাই আপাতত কম লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং শিল্প খাতে যতটা সম্ভব গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি।”
তিনি জানান, এফএসআরইউ মেরামতের কাজে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা যুক্ত রয়েছেন। মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য তখন পুরো সিস্টেম প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ওই সময় সাময়িকভাবে গ্যাস-সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৯ লক্ষ্য করে নতুন অবকাঠামো
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ২০২৯ সালকে সামনে রেখে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে বলে জানান মন্ত্রী। ইতোমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি। ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস বিভিন্ন কারখানায় সরবরাহের জন্য ৩০টি ট্রাক চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরাসরি কনটেইনারে গ্যাস সরবরাহের সুবিধা চালুর বিষয়েও মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
শিল্প উৎপাদন কমেছে ৩৫-৪০ শতাংশ
সংলাপে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে দেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তিনি বলেন, সংকটের কারণে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যাওয়ায় তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় গ্যাস সরবরাহে শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আমদানিনির্ভরতার কারণে সংকট: সিপিডি
সিপিডির মূল প্রবন্ধে বলা হয়, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা ও জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশের বর্তমান সংকট আরও গভীর হয়েছে। সংস্থাটির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির জানান, দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে এলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে সিপিডি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাময়িক পদক্ষেপের পরিবর্তে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানির মূল্যনীতি ও ভর্তুকি ব্যবস্থায় সংস্কারের তাগিদ দেন তিনি।
স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের তাগিদ
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশের অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে আসায় সংকট আরও বাড়ছে।
দ্রুত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, সঠিক মূল্যনীতির অভাব ও সিস্টেম লসের কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু সরবরাহ বাড়ানোর দিকে নজর না দিয়ে জ্বালানির চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সংলাপে শিল্প খাতে নির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ, সিস্টেম লস কমানো, সৌরবিদ্যুৎ ও স্টোরেজ প্রযুক্তিতে প্রণোদনা এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।