শিরোনাম

সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে পরীক্ষার ফি আদায়, বোদায় শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ

সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে পরীক্ষার ফি আদায়, বোদায় শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও উপজেলার ৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩০ থেকে ৭০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে চার লাখ টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বোদা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজমল আজাদের নির্দেশনাতেই এ অর্থ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়নের প্রশ্নপত্র নিজ নিজ বিদ্যালয়ে প্রণয়নের কথা থাকলেও কয়েকটি ক্লাস্টারের বিদ্যালয়ে ইউনিয়নভিত্তিকভাবে একই প্রশ্নপত্র সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে উপজেলার ময়দানদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লালদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাকপুর কেরামতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মানিকপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেঁপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাকডোকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কালিয়াগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পরীক্ষার ফি নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

তবে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকরা বিদ্যালয়গুলোতে যাওয়ার পরপরই বিষয়টি পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেকে পরীক্ষার ফি নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ফি নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩০ টাকা এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।

কালিয়াগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী গুরুদেব বলে, ‘আমাদের কাছ থেকে ৭০ টাকা পরীক্ষার ফি নেওয়া হয়েছে। আমাদের কেউ কোনো টাকা ফেরত দেয়নি।’

লালদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া বলে, ‘আমি ৫০ টাকা পরীক্ষার ফি দিয়েছি। স্যারেরা আমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন।’

তেঁপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরতি রানী রায় বলেন, ক্লাস্টারের নির্দেশনা অনুযায়ী এটি করা হয়েছে। ক্লাস্টার পর্যায়ে সভা করে বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রশ্নপত্র তৈরির কথা জানানো হয়েছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই ক্লাস্টার থেকে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

মানিকপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু সায়েব বলেন, কয়েকটি বিদ্যালয় মিলে গুচ্ছ আকারে প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়েছে। একেকটি বিদ্যালয়কে একেকটি বিষয়ের প্রশ্ন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ১২ থেকে ১৪টি বিদ্যালয় মিলে একসঙ্গে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

কে এ কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিয়েছেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেংহারী ইউনিয়নের বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে তিনি সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তবে এটি ময়দানদীঘি ক্লাস্টারের আওতাধীন হলেও প্রশ্নপত্র ইউনিয়নভিত্তিকভাবে করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কালিয়াগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবিদা সুলতানা বলেন, ‘আমাদের কোনো শিক্ষক পরীক্ষার ফি নিয়ে থাকলে আমরা তা ফেরত দেব।’

তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি নেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজমল আজাদ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি নেওয়ার কোনো নির্দেশনা আমাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। গত পরশুদিনের সভাতেও স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, কোনোভাবেই পরীক্ষার ফি নেওয়া যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, কোনো বিদ্যালয় ফি নিয়ে থাকলে তা শিক্ষার্থীদের ফেরত দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্নপত্র ইউনিয়নভিত্তিকভাবে একাধিক বিদ্যালয়ে সরবরাহের অভিযোগও অস্বীকার করেন আজমল আজাদ। তাঁর দাবি, ইউনিয়নভিত্তিক শিক্ষক কমিটি করে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছে। মানসম্মত প্রশ্ন তৈরির জন্য কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিলে প্রশ্ন তৈরি করেছেন। তিনি নিজে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছেন—এমন অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।

বোদা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পেরে আমি কয়েকজন শিক্ষককে ফোনে এবং সরেজমিনে গিয়ে তথ্য নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার ফি নেওয়া এবং প্রশ্নপত্র সরবরাহের বিষয়টির কিছু সত্যতাও পাওয়া গেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো পরীক্ষার ফি নেওয়ার নিয়ম নেই। বিষয়টি বর্তমানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পঞ্চগড় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী মিঞা বলেন, ‘বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে এই প্রথম জানতে পারলাম। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর