নরসিংদীতে বৈধভাবে প্রতি মাসে কত লিটার মদ আসে, কত লিটার বিক্রি হয় এবং পারমিটধারীদের প্রকৃত চাহিদা কত—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নরসিংদীর কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে জেলার পারমিটধারীর সংখ্যা নিয়েও অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে।
নিখাদ খবরকে মুঠোফোনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নরসিংদীর উপপরিচালক মোহাম্মদ হাবীব তৌহিদ ইমাম জানান, জেলায় প্রায় ৬০০ জন পারমিটধারী রয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন পারমিটধারী সর্বোচ্চ সাড়ে ৮ লিটার মদ পান করতে পারেন। সেই হিসাবে ৬০০ জনের পূর্ণ কোটা বিবেচনা করলে মাসে সম্ভাব্য চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ১০০ লিটার।
তবে অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাহীদা বেগমের দেওয়া তথ্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, নরসিংদীতে পারমিটধারীর সংখ্যা প্রায় ৭০০ জন। একজন পারমিটধারী সর্বোচ্চ ৯ লিটার মদ পান করতে পারেন—এই হিসাব ধরে ৭০০ জনের পূর্ণ কোটা বিবেচনা করলে মাসিক সম্ভাব্য চাহিদা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৩০০ লিটার।
অর্থাৎ পারমিটধারীর সংখ্যা ও একজনের সর্বোচ্চ মাসিক পরিমাণ—দুই ক্ষেত্রেই দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
তবে এই ৬০০ বা ৭০০ জনের মধ্যে কতজন নিয়মিত মদ পান করেন, কতজনের পারমিট বর্তমানে সক্রিয় এবং বাস্তবে প্রতি মাসে কত লিটার মদ বিক্রি হচ্ছে—এসব বিষয়ে কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
পরিদর্শক সাহীদা বেগম জানান, পারমিটধারীদের অনেকেই নিয়মিত মদ পান করেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর একমাত্র মদের দোকানের মালিক রুবেল মিয়া তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী মদ কিনে আনেন। বিক্রি না হলে মজুতও রাখতে পারেন। তবে পারমিট ছাড়া কোনো ব্যক্তির কাছে মদ বিক্রির সুযোগ নেই।
সরকারি বিধিমালায় অ্যালকোহল বিক্রি ও পারমিটের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাগরিক সনদেও দেশি ও বিলাতি মদ পানের পারমিটের জন্য নির্ধারিত আবেদন ও শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মদের দোকান থেকে নামে-বেনামে পারমিট তৈরি করে মদ সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এসব পারমিট নিয়মিত যাচাই-বাছাই করা হয় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তাঁরা এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে পারমিটের তালিকা, ইস্যুর রেজিস্টার এবং বিক্রয়সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদী জেলায় দেশি মদ বিক্রির লাইসেন্সধারী দোকান হিসেবে ‘পাট্টা’ নামে একটি দোকান রয়েছে। শহরের বৌয়াকুড় মোড়ে অবস্থিত দোকানটি দীর্ঘদিন ধরে মদ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নরসিংদীর উপপরিদর্শক মো. ছানাউল্লাহ মিয়া জানান, ‘পাট্টা’র মূল মালিক আজীজ মিয়া মারা যাওয়ার আগে রুবেল নামে এক ব্যক্তির কাছে দোকানটি বিক্রি করে যান। তাঁর দাবি, রুবেলের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে।
স্থানীয় কয়েকজন নাগরিকের প্রশ্ন, জেলার পারমিটধারীদের কাছে একটি দোকানের মাধ্যমে মদ সরবরাহ করা হলে দোকানটি মাসে কত লিটার মদ কিনছে, কত লিটার বিক্রি করছে এবং কত লিটার মজুত রাখছে—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা হচ্ছে কি না।
তাঁদের মতে, বৈধ মদ বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রয়, বিক্রয়, মজুত ও পারমিটধারীদের কাছে সরবরাহের পরিমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয় আরেকটি সূত্রের অভিযোগ, মদের দোকানকে কেন্দ্র করে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। মদ্যপানকে কেন্দ্র করে মাতলামি ও অপরাধের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে। সম্প্রতি মদের বাকিতে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে দোকানের এক কর্মচারী রাব্বিকে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগের ঘটনাও সামনে এসেছে। ওই ঘটনায় পুলিশ মামলা ও গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।
তবে মদের দোকানকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি কিংবা অন্যান্য অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণে তদন্ত ও মামলার নথিই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে নরসিংদীতে বৈধ মদ সরবরাহের প্রকৃত পরিমাণ, দোকানের মাসিক ক্রয়-বিক্রয়, মজুত এবং সক্রিয় পারমিটধারীর সংখ্যা—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে থাকা সংখ্যাগত অসঙ্গতির কারণও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।