শিরোনাম

বিয়ের সাজের বদলে চার কফিন, হবু স্ত্রীকে হারিয়ে অদিতের হৃদয়বিদারক বার্তা

বিয়ের সাজের বদলে চার কফিন, হবু স্ত্রীকে হারিয়ে অদিতের হৃদয়বিদারক বার্তা

বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছিল। দুই পরিবারে চলছিল নতুন জীবনের প্রস্তুতি। স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে ঘর বাঁধার। কিন্তু বিয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে নির্মম হত্যাকাণ্ডে থেমে গেল সব আয়োজন। হবু স্ত্রী আগামী চক্রবর্তীকে হারিয়ে শোকাহত অদিত কর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো।’ হৃদয়বিদারক এই বার্তায় ফুটে উঠেছে প্রিয় মানুষকে হারানোর গভীর শোক ও অসহায়ত্ব।

রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে অদিত করের বিয়ের দিনক্ষণও চূড়ান্ত হয়েছিল। দুই পরিবারের সম্মতিতে চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি। নতুন সংসারের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন দুজন। কিন্তু সেই স্বপ্নের জায়গা এখন দখল করেছে শোক আর নিস্তব্ধতা।

রোববার রাতে ‘কারমাইকেল কলেজ ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশনস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে আগামী ও অদিতের একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির সঙ্গে অদিতের দেওয়া বার্তাটি মুহূর্তেই স্বজন ও পরিচিতজনদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেলো।’

অদিত আরও লেখেন, ‘এটা বুধবারের ছবি। খুব করে বলল সেদিন, “আমরা তো কখনও কাপল পিক তুলি নাই, চলো আজকে তুলি।” চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো।’

কয়েক দিন আগেও যে মানুষটি বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, সেই মানুষটির এখন প্রিয়তমার শেষ স্মৃতি আঁকড়ে থাকার চেষ্টা। নির্মম বাস্তবতায় আগামী আর ফিরবেন না, ফিরবে না তাদের সাজানো সংসারের স্বপ্নও।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

স্বজনদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকে পরিবারটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে শনিবার রাতে বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বের হলে স্বজন ও স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে বাড়ির তালা ভেঙে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে। সেখানে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।

আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। সামনে ছিল নতুন জীবনের হাতছানি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা অদিত করের সঙ্গে তাঁর বিয়ের প্রস্তুতিও চলছিল। অথচ সেই বিয়ের আয়োজনই এখন পরিণত হয়েছে শোকের স্মৃতিতে।

আগামীর এক বন্ধু জানান, দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে চূড়ান্ত হয়েছিল। অদিত বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু একসঙ্গে হবু স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁর ভাষায়, ‘অদিত কর হবু স্ত্রীকে হারিয়ে ট্রমাটাইজড। তাকে কীভাবে সান্ত্বনা দেবো, বুঝতে পারছি না।’

একদিকে চারটি কফিন, অন্যদিকে অসমাপ্ত বিয়ের আয়োজন—রংপুরের এই হত্যাকাণ্ড এক নিমেষেই ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং এক তরুণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। আগামীকে হারিয়ে অদিতের সেই প্রতিশ্রুতিই এখন কেবল শোকের প্রতিধ্বনি—‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো।’

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর