শিরোনাম

সাতক্ষীরায় ৯ মাসে পানিতে ডুবে ২০ মৃত্যু, ১৭ জনই শিশু

সাতক্ষীরায় ৯ মাসে পানিতে ডুবে ২০ মৃত্যু, ১৭ জনই শিশু

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে পুকুর, নদী ও মাছের ঘেরে ডুবে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৭ জনই শিশু। বাকি তিনজনের মধ্যে দুজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মে থেকে সেপ্টেম্বর—এই পাঁচ মাসে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ১৯ দিনেই পানিতে ডুবে প্রাণ গেছে পাঁচজনের। স্থানীয়ভাবে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এসব শিশুর অধিকাংশই বাড়ির পাশের অরক্ষিত পুকুর বা জলাশয়ে ডুবে মারা গেছে।

সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়িয়ায় পানিতে ডুবে মারা যান আমেনা খাতুন (৮০)। এর আগের দিন ১৮ সেপ্টেম্বর উপজেলার বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায় দুই শিশু আব্দুল্লাহ (৮) ও ইকবাল (৭)। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই।

১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা শহরের বাগানবাড়ি এলাকায় একসঙ্গে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায় স্কুলশিক্ষার্থী লাবিব (১০) ও হাবিবা (৯)। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর তালায় পানিতে ডুবে মারা যায় সাড়ে তিন বছর বয়সী শিশু আরিয়ান।

বাড়ির পাশের পুকুরই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ

স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাই ঘটছে বাড়ির আশপাশের অরক্ষিত পুকুর ও জলাশয়ে। এসব জলাশয়ের অনেকগুলোর চারপাশে কোনো বেড়া বা নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। ফলে পরিবারের সদস্যদের অজান্তেই শিশুরা পানির কাছে চলে যাচ্ছে।

কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুর রহমান বলেন, সম্প্রতি পরপর কয়েকটি পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে দেখা গেছে, বাড়ির পাশে থাকা পুকুর বা জলাশয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকা এবং অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের সাঁতার শেখানোর বিষয়টিও আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিন বছর ধরে বন্ধ সাঁতার শেখানোর কার্যক্রমের অভিযোগ

শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু ঠেকাতে সাঁতার শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সাতক্ষীরা সমাজকর্মী সাকিবুর রহমান বাবলার অভিযোগ, জেলা শিশু একাডেমিতে প্রায় তিন বছর ধরে শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, শিশুদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশু একাডেমির আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি পানিতে ডুবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো দরকার।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, শিশুমৃত্যু রোধে পরিবারের সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের সাঁতার শেখানোর প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সহযোগিতা পাওয়া গেলে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করার উদ্যোগ

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, প্রতিটি প্রাণহানিই অত্যন্ত দুঃখজনক। ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা জোরদার করা হবে। শিশুদের সাঁতার শেখানোর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, জেলায় সাঁতার না জানার কারণে পুকুরের পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এ বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে শিশুদের সচেতন করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সচেতন মহলের মতে, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে শুধু পরিবারকে দায়ী না করে বাড়ির পাশের অরক্ষিত জলাশয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পানিতে ডুবে প্রাণহানির হার কমানো সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর