২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবে।
এর আগে ৩০ জুন ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুকে আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে প্রতিটি অভিযোগে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন। সাজাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তাঁকে মোট ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এসব অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও সহযোগিতার পাশাপাশি আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নিপীড়নের ঘটনায় তাঁর দায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাঁকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন।
যে তিন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছিল, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ছবি দেখে তাঁদের তালিকা তৈরি এবং আটক ও নির্যাতনের জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইনু। ট্রাইব্যুনাল এ অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন।
ষষ্ঠ অভিযোগে ১৪ দলীয় জোটের একটি সভায় উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইনুর সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়। এ অভিযোগেও তাঁর দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
সপ্তম অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়। ট্রাইব্যুনাল এটিও প্রমাণিত বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন।
এই তিন অভিযোগে পৃথকভাবে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সাজাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর হবে। ফলে কার্যকর কারাদণ্ডের মেয়াদ ১০ বছর।
যে পাঁচ অভিযোগে খালাস
দ্বিতীয় অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের সভায় আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে ইনুর সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এ অভিযোগে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ অভিযোগে আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, ছত্রীসেনা নামানো এবং হেলিকপ্টার থেকে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। পঞ্চম অভিযোগে বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি এবং সরকার পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন-নিপীড়নকে সমর্থনের অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি বলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে খালাস দেন।
অষ্টম অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যায় নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। একই অভিযোগে সারা দেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও ছিল। এই অভিযোগ থেকেও ইনুকে খালাস দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের আপিল
৩০ জুন রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউশন জানিয়েছিল, ইনুর ১০ বছরের সাজা নিয়ে তারা আপিল করবে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপিলের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে।
এ মামলায় ইনু ছিলেন একমাত্র আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। বিচার শেষে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত এবং পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করেন।
এদিকে, হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে আরেকটি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।